সাহিত্যজগতে নক্ষত্রপতন। প্রয়াত হলেন বিশিষ্ট ভারতীয় বংশোদ্ভূত কবি, ঔপন্যাসিক, অনুবাদক ও প্রাবন্ধিক কেতকী কুশারী ডাইসন। শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। গত ৩১ অগাস্ট তিনি হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তার পর থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার ভোরে লড়াই থামে এই বিদগ্ধ সাহিত্যিকের।

১৯৪০ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন কেতকী কুশারী। প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য পাঠ শেষ করে তিনি উচ্চশিক্ষার্থে চলে যান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকেই পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ব্রিটিশ শাসনের শুরুর দিক থেকে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের প্রাক্‌মুহূর্ত পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশে থাকা ইংরেজ পুরুষ ও নারীদের দিনলিপি এবং আত্মস্মৃতির বিশ্লেষণ ছিল তাঁর গবেষণার বিষয়। পরবর্তীতে তিনি পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র রবার্ট ডাইসনকে বিয়ে করেন। কেতকীদেবীর বহু সৃষ্টিশীল কাজেই তাঁর সঙ্গী ছিলেন স্বামী রবার্ট।

বাংলা ও ইংরেজি, উভয় ভাষার সাহিত্যচর্চাতেই সমান সাবলীল ছিলেন কেতকী। তাঁর রচনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বুদ্ধদেব বসুর গভীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এই দুই দিকপালের বহু লেখা তিনি পরম দক্ষতায় ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত তাঁর বহুল চর্চিত গবেষণাধর্মী উপন্যাস ‘রবীন্দ্রনাথ ও ভিকতোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে’র জন্য তিনি প্রথম বার আনন্দ পুরস্কার পান। পরবর্তীকালে ১৯৯৭ সালে তিনি পুনরায় এই সম্মানে ভূষিত হন। এ ছাড়া তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুবনমোহিনী দাসী পদকও লাভ করেন। ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’ ইংল্যান্ডে বসবাসকারী অভিবাসীদের জীবনসংগ্রাম ও মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েনকে তুলে ধরে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।

কবি হিসেবেও তিনি দুই ভাষাতেই সমান সফল। বাংলায় তাঁর ‘সবীজ পৃথিবী’, ‘জলের করিডোর ধরে’, ‘কথা বলতে দাও’ এবং ইংরেজিতে ‘স্যাপ-উড’, ‘হিবিস্কাস ইন দ্য নর্থ’ পাঠকসমাদৃত। প্রবন্ধকার হিসেবেও নিজের অসামান্য মেধার ছাপ রেখেছেন তিনি। সুশোভন অধিকারী এবং রবার্ট ডাইসনের সঙ্গে যৌথ ভাবে রচিত ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’ ছাড়াও তাঁর ‘ভাবনার ভাস্কর্য’ ও ‘শিকড়বাকড়’ উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। তাঁর প্রয়াণে দুই দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি মহলেই নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।