অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (Sarat Chandra Chattopadhyay)। এইবছর পালিত হচ্ছে তাঁর সার্ধশত জন্মবর্ষ ( Birth Anniversary) । পাশাপাশি তাঁর অনন্য সৃষ্টি ‘পথের দাবী’র ( Pather Dabi) প্রথম প্রকাশের শতবর্ষ। এই উপন্যাসের পাতায় পাতায় রয়েছে মানুষকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলার প্রেরণা। লিখলেন অংশুমান চক্রবর্তী 

 

বাংলা সাহিত্যের  অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। সহজ-সরল ভাষা, গভীর মানবপ্রীতি এবং মানুষের সুখ-দুঃখের জীবন্ত চিত্রায়নের জন্য অমর হয়ে আছেন। সমাজের লাঞ্ছিত ও নিপীড়তরা তাঁর গভীরতম সহানুভূতি পেয়েছেন। পর্যবেক্ষণের সূক্ষ্মতা ও বিশ্লেষণ সহযোগে তাঁদের অবস্থার কথা বর্ণনা করেছেন, যা অবশ্যই উল্লেখের দাবি রাখে। তিনি সামাজিক সমস্যাগুলির কোনও সমাধান নির্দেশের চেষ্টা করেননি, তবে আমাদের আনুগত্যের প্রতি সমাজের দাবি সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন। গভীরভাবে পীড়িত ছিলেন সামাজিক বিবিধ বিধিনিষেধ দ্বারা সৃষ্ট দুঃখ-কষ্ট ও দুর্দশা বিষয়ে। বাঙালি পাঠকদের মধ্যে তাঁর অতুলনীয় জনপ্রিয়তা। আজও। বহু ভারতীয় ভাষায় তাঁর বইগুলি অনূদিত হয়েছে এবং সেইসব ভাষায় উপন্যাসের বিকাশকে তা প্রভাবিত করেছে। বাঙালি চরিত্রের শক্তি ও দুর্বলতাগুলো তাঁর লেখায় প্রতিফলিত হয়েছে বারবার। তাঁর উপন্যাস দ্রুত ও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। লিখেছেন বিভিন্ন ধরনের গল্প-উপন্যাস। তাঁর প্রায় সব লেখায় শক্তিশালী উদ্দেশ্যমূলক পর্যবেক্ষণ বর্তমান। প্রতিভার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ ঘটেছে তাঁর জীবনের মধ্যপর্বের কাজগুলির মধ্যে। সেইগুলোতে প্রবলভাবে রয়েছে সত্যের ছাপ। বইগুলোতেই তিনি চিত্রিত করেছেন সেইসব চরিত্রগুলো, যেসব চরিত্র তাঁর গভীরভাবে চেনা। চরিত্ররা সেইসব জীবন্ত নারী-পুরুষ, যাঁদের জীবনের সঙ্গে তিনি নিজের জীবনকে ভাগ করে নিয়েছিলেন। তাঁরা কোনও পূর্বধারণাকৃত পরিকল্পনা অনুযায়ী সৃষ্ট নন, বরং কল্পনা ও অভিজ্ঞতার মিলনের ফল হিসেবেই তাঁদের সৃষ্টি। 

আরও পড়ুন: মাইহার থেকে বিশ্বমঞ্চ, সুরের সাম্রাজ্য গড়েছিলেন আলাউদ্দিন খাঁ

শরৎচন্দ্রের জন্ম ১৮৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। এইবছর সাড়ম্বরে পালিত হচ্ছে তাঁর সার্ধশত জন্মবর্ষ। সেই সঙ্গে তাঁর অনন্য সৃষ্টি ‘পথের দাবী’র প্রথম বই আকারে প্রকাশের শতবর্ষ। দেশ সম্পর্কে ধারণা, জাতীয়তা এবং আন্তর্জাতিকতার বোধ নিয়ে নানা বিতর্ক আবার নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে সমকালের ভারতে। শতবর্ষ আগে, বিংশ শতকের তৃতীয় দশকের ভারতেও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষিতে এই প্রশ্নগুলো উঠেছিল। সেই সময়ের চিহ্ন এবং সময়ের দাবি সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে ছিল ‘পথের দাবী’ উপন্যাসটিকে। নিহিত এবং আরও ব্যাপক অর্থে রাজনীতি আছে শরৎচন্দ্রের সব উপন্যাসেই। সমাজে মেয়েদের অবস্থান, সামন্ততান্ত্রিক ক্ষমতার বিন্যাস, হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্ক প্রসঙ্গে সেই রাজনীতিবোধের উপস্থিতি। কিন্তু স্বদেশ এবং প্রত্যক্ষ রাজনীতি সম্পর্কে শরৎচন্দ্রের ভাবনা সবচেয়ে বেশি সরাসরি এসেছে ‘পথের দাবী’ উপন্যাসেই। উপন্যাসের রাজনীতি-বোধও একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও সময় থেকেই জন্ম নিয়েছিল।

প্রথমে ‘পথের দাবী’ ধারাবাহিক ভাবে ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হত। ‘বঙ্গবাণী’র মালিক পত্রিকায় ছাপার জন্যে নতুন লেখার সন্ধানে আসেন শরৎচন্দ্রের কাছে। কিন্তু নতুন কোনও লেখা ছিল না বলে শরৎচন্দ্র আর কথা বাড়াননি। একপর্যায়ে নাছোড়বান্দা মালিকের চোখে পড়ে ‘পথের দাবী’র পাণ্ডুলিপির উপর, কিন্তু শরৎচন্দ্র তা প্রকাশ করতে নারাজ। ‘বঙ্গবাণী’র মালিক কিন্তু হাল ছাড়েন না। পাণ্ডুলিপিটি আদায় করে নেন এবং ধারাবাহিকভাবে ছাপেন।

১৯২৬ সালের অগাস্টে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ‘পথের দাবী’। অনেকটা পথে পেরিয়ে একরকম বিদ্রোহের মধ্য দিয়েই উপন্যাসের জন্ম। প্রকাশিত হওয়া মাত্রই ঝড় তোলে। কাঁপিয়ে দেয় শাসকের বুক। কী রয়েছে লেখাটির মধ্যে? “আমরা সবাই পথিক। মানুষের মনুষ্যত্বের পথে চলবার সর্বপ্রকার দাবি অঙ্গীকার করে আমরা সকল বাধা ভেঙেচুরে চলব’’—এই হল ‘পথের দাবী’র মূলমন্ত্র। সাদা চামড়া না হওয়ার অপরাধে যখন কাউকে বেঞ্চে বসতে দেওয়া হয় না, আইনের কাছে যখন নিপীড়ক পার পেয়ে যায়, শাস্তি পায় নিপীড়িতরা, তখন বোঝা যায় স্বাধীনতা কী চরমভাবে অবহেলিত হচ্ছে, কী ভীষণ রকমের দরকার হয়ে উঠেছে স্বাধীনতার ছোঁয়া। স্বাধীনতা মানে তো কেবল শুধুমাত্র দুইবেলা ভরপেট খাবার খাওয়া নয়, স্বাধীনতার ব্যাপ্তি আরও অনেক বেশি বিস্তৃত। সেই সময়টা ছিল ব্রিটিশ শাসিত। পরাধীনতার শেকল ভেঙে এক নতুন জাগ্রত সমাজ তৈরির স্বপ্ন দেখেছিলেন শরৎচন্দ্র। তারই প্রতিচ্ছবি ‘পথের দাবী’। তিনি মনে করতেন, আঘাতে আঘাতে সমাজকে পরিবর্তন করতে হবে আগামীর জন্য। বলেছিলেন, “পথের দাবীর বাস্তব প্রতিফলন ঘটাচ্ছে সূর্য সেন। আমার আশীর্বাদ রইলো তার সাথে।” শরৎচন্দ্রের এই ভাবমূর্তি দেখা যায় মূল চরিত্র সব্যসাচীর মাধ্যে। তিনিই এই বিপ্লবের নায়ক। 

উপন্যাসের পাতায় পাতায় রয়েছে মানুষকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলার এক প্রেরণা। শুধুমাত্র শান্তিতে দিন পার করাই জীবনের স্বার্থকতা নয়। শাসক যখন হয় শুধুমাত্র শোষণের জন্য, তখন সেই শাসনরূপী শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে ‘পথের দাবী’র দরকার অবশ্যই আছে।

কিন্তু ‘পথের দাবী’র এই পথচলা সহজ ছিল না। জীবন যাত্রায় মানুষের পথচলার এই অধিকার যে কতখানি বিশাল, তা যেন মানুষ ভুলে গেছে। নানা বন্ধুর পথ পেরিয়ে চলা ‘পথের দাবী’র। তার মধ্যে আসে নানা বাধা বিপত্তি, কিন্তু তা-ই বলে তো থেমে গেলে তো হবে না। বহুদিনের চলতে থাকা সমাজের সংস্কারকে সরিয়ে নতুন জায়গা দিতে সংগ্রাম তো চালিতে যেতেই হয়। সেটাই ‘পথের দাবী’।

উপন্যাসটা নিয়ে সেই বছরের বর্ষপঞ্জিতে বলা হয়েছিল, বইটির প্রতিটি পৃষ্ঠায় রয়েছে রাষ্ট্রদ্রোহের উপাদান। কলকাতার তৎকালীন পুলিশ কমিশনার এই সম্পর্কে সরকারের চিফ সেক্রেটারিকে জানান। চিফ সেক্রেটারি বইটিকে ‘বিষময়’ বলে উল্লেখ করেন। কলকাতার পাবলিক প্রসিকিউটরও বইটিকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘উস্কানিমূলক’ বলে আখ্যা দেন। এই তিনজনের সুপারিশের উপর ভিত্তি করে করে অবশেষে ১৯২৭ সালের ৪ জানুয়ারি ‘পথের দাবী’-কে বাজেয়াপ্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু ততদিনে প্রায় তিন হাজার বই পাঠকের কাছে পৌঁছে গিয়েছে। সর্বত্র বই বাজেয়াপ্ত করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এমনকি আইনসভাতেও বই বাজেয়াপ্ত করা নিয়ে হয় বাকবিতণ্ডা। বই কেন বাজেয়াপ্ত করা হবে, এই নিয়ে আইনসভায় কথা বলেন হরেন্দ্রনাথ চৌধুরী, সুভাষচন্দ্র বসু প্রমুখ। অনেকেই শরৎচন্দ্রকে বইয়ের কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তনের কথা বলেন। কিন্তু তিনি বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করেননি। পরিবর্তন করেননি একটি শব্দও। পরে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হলে ‘পথের দাবী’ আবারও ছাপা হয়।

১৯৪৭ সালে প্রথমবার চলচ্চিত্রায়িত হয় ‘পথের দাবী’। বাংলায়। ১৯৪৮ সালে এই কাহিনি অবলম্বনে হিন্দিতে নির্মিত হয় ‘সব্যসাচী’ চলচ্চিত্র। প্রায় ৫০ বছর আগে, ‘পথের দাবী’ নিয়ে তৈরি হয় বাংলা চলচ্চিত্র ‘সব্যসাচী’। নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন মহানায়ক উত্তমকুমার। এইবছর পালিত হচ্ছে তাঁর জন্মশতবর্ষ। উপন্যাসটি আজও চর্চিত এবং পঠিত।