সমীক্ষা বলছে বিশ্বের নিরিখে ভারতবর্ষে অঙ্গদানের পরিসংখ্যান লক্ষণীয়ভাবে কম। এদেশে এই বিষয়টি নিয়ে সচেতনতার অভাব রয়েছে আর রয়েছে নানা কুসংস্কার। ১৩ অগাস্ট বিশ্ব অঙ্গদান দিবস। এই উপলক্ষে লিখলেন শর্মিষ্ঠা ঘোষ চক্রবর্তী।
অঙ্গদানেই নতুন জীবন
Sponsored

প্রায় ১৪৭ কোটির ভারতবর্ষ এমন এক দেশ যেখানে অঙ্গদানের হার সবচেয়ে কম! অথচ বর্তমান বিশ্বের মধ্যে ভারতে অঙ্গের চাহিদা অনেকটাই বেশি কিন্তু অঙ্গদাতার সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে কম। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভারতে মৃত ব্যক্তির অঙ্গদানের হার প্রতি ১০ লক্ষে একজনেরও কম। ভারতে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের চাহিদা ৫ লক্ষের বেশি। বাস্তবে অঙ্গ প্রতিস্থাপিত হয় ২০ হাজারেরও কম। প্রতি বছর এই অপ্রাপ্যতার কারণে বহু অপেক্ষায় থেকে হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। বিশ্বে সর্বোচ্চ অঙ্গদানের হারযুক্ত দেশ হল স্পেন। এই দেশে প্রতি ১০ লক্ষ জনসংখ্যায় ৫০ জনেরও বেশি অঙ্গদান করে। ভারতবর্ষের এমন করুণ চিত্র তার মূল কারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব, সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কার এবং চিকিৎসা পরিকাঠামোর সীমাবদ্ধতা। তাই অঙ্গদান সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে, মৃত্যু-পরবর্তিতে অঙ্গদানে উদ্বুদ্ধ করতে এবং ভ্রান্ত কুসংস্কার দূর করতে প্রতিবছর ১৩ অগাস্ট পালিত হয় ‘বিশ্ব অঙ্গদান দিবস’।
কেন প্রয়োজন হয় অঙ্গদানের?
কোনও রোগীর কোনও অঙ্গ বিকল হয়ে গেলে সেই অঙ্গের জায়গায় নতুন অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা হয়ে থাকে। আর তখনই অঙ্গদানের প্রয়োজন পড়ে।জীবিত বা মৃত ব্যক্তি উভয়ের কাছ থেকেই প্রয়োজনে অঙ্গ নেওয়া যায়। তাই জীবিত এবং মৃত দুই অবস্থাতেই অঙ্গদান করা যায়। ভারতে, মানব অঙ্গ অপসারণ, সংরক্ষণ এবং প্রতিস্থাপন ১৯৯৪ সালের মানব অঙ্গ প্রতিস্থাপন আইন (THOA) অনুসারে পরিচালিত হয়, যা অঙ্গ প্রতিস্থাপনের বৈধতা নিয়ন্ত্রণ করে। ২০১১ সালে আইনটি সংশোধন করে ‘মানব অঙ্গ ও টিস্যু প্রতিস্থাপন আইন’ Transplantation of Human Organs and Tissues Act (THOTA) নামকরণ করা হয়।
চাইলেই কি অঙ্গদান করা যায়?
যে ব্যক্তির শরীর থেকে অঙ্গ নেওয়া হয় তিনি ‘দাতা’ বা ‘ডোনার’। আর যাঁর শরীরে সেই অঙ্গ প্রতিস্থাপিত হচ্ছে, তাঁকে বলা হয় ‘গ্রহীতা’ বা ‘রেসিপিয়েন্ট’৷ কিন্তু সকলেই কি অঙ্গদান করতে পারেন? উত্তর হল হ্যাঁ সকলেই পারেন অঙ্গদান করতে, কিন্তু যাঁদের কো-মর্বিডিটি রয়েছে যেমন ডায়াবেটিস-আক্রান্ত, উচ্চরক্তচাপ রয়েছে যাঁদের, ক্যান্সার রোগী, হেপাটাইটিসের রোগী, এইডস আক্রান্ত, নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে অঙ্গদান করা যায় না। যদিও ক্যান্সার-আক্রান্ত ব্যক্তি কর্নিয়া দান করতে পারেন। তবে এদেশে অঙ্গদাতার সংখ্যা এতই কম যে, কোনও দাতার লিভার কিডনি যদি সম্পূর্ণ সুস্থ নাও থাকে, অল্প বিস্তর সমস্যা থাকে তা হলেও অঙ্গ নেওয়া হয়।মৃত অঙ্গদাতার অঙ্গদানের নির্দিষ্ট কোনও বয়সসীমা নেই তবে জীবিত অঙ্গদাতার বয়স সাধারণত ১৮ বছর বা তার বেশি হলে ভাল। অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে অঙ্গদাতা আইনি কারণে অভিভাবকের অনুমতি সাপেক্ষেই একমাত্র অঙ্গদান করতে পারে। যদিও মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচাতে এই অঙ্গদান প্রক্রিয়াতেও অনেক বাধা রয়েছে। অনেকদিন অপেক্ষা করতে হয়। মানুষের সব ধরনের অঙ্গ এখনও পর্যন্ত কৃত্রিমভাবে তৈরি করা সম্ভব হয়নি। ফলে আজও অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে অন্য মানবদেহই একমাত্র বিকল্প। কৃত্রিম হৃদযন্ত্রের সাহায্যে মরণাপন্ন রোগীকে বাঁচানো যায় তবে সেই সময়সীমা দশবছরের বেশি নয়।
অঙ্গদানের কী নিয়ম?
কোনও ব্যক্তির মৃত্যুর ৩৬ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত ভেন্টিলেশন, ইন্ট্রাভেনাস ফ্লুইড ও অক্সিজেনের সহায়তায় অঙ্গ ক্রিয়াশীল রাখা সম্ভব। তাই এই অঙ্গদান প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে জরুরি হল তৎপরতা। একবার অঙ্গটি দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে যত দ্রুত সম্ভব প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়া শেষ করতে হয়। অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মধ্যে রয়েছে প্রধান কিছু অঙ্গ যেমন— ফুসফুস, হৃদযন্ত্র, কিডনি, অন্ত্র, অগ্ন্যাশয়, যকৃৎ বা লিভার ইত্যাদি। শুধু মৃত ব্যক্তি নয় কোনও ব্যক্তির ‘ব্রেন ডেথ’ বা মস্তিষ্কের মৃত্যু হলে এই সব অঙ্গ প্রতিস্থাপন সম্ভব৷ এছাড়া শরীরের বেশ কিছু অংশের ‘টিস্যু’ বা তন্ত্র প্রতিস্থাপনও করা যায় যেমন, চোখের কর্নিয়া, ত্বক, হৃদযন্ত্রের কপাটিকা (ভালভ), হাড়, শিরা৷মানব অঙ্গ ও টিস্যু প্রতিস্থাপন আইন অনুসারে, ব্রেন ডেথ দাতার কাছ থেকে ৩৭টি বিভিন্ন অঙ্গ ও টিস্যু দান করা যেতে পারে, তবে হৃৎপিণ্ড-বিকল দাতার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে সেক্ষেত্রে শুধুমাত্র ত্বক, হাড়, কর্নিয়া এবং রক্তনালির মতো কয়েকটি অঙ্গ দান করা যায়।অঙ্গদান মানে জীবনদান অঙ্গদাতা স্বেচ্ছায় তাঁর অঙ্গদানের অঙ্গীকার করতে পারেন। একজন মানুষের অঙ্গদানে সাত থেকে আটজনের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। স্ট্রোকের কারণে যে রোগীর মৃত্যু হয় তাঁর দুটি কিডনি, একটি লিভার, হৃৎপিণ্ড, দুটি কর্নিয়া এবং ত্বক— এতগুলো অঙ্গ পাওয়া যায়। লিভার, কিডনি, হার্ট, কর্নিয়া ইত্যাদি প্রতিস্থাপন করলে একাধিক মানুষ নতুন করে জীবন ফিরে পান। জীবিত মানুষ নিজের দুটি কিডনির একটি এবং লিভারের কিছুটা অংশ দান করতে পারেন। সেক্ষেত্রে সাধারণত নিকট-আত্মীয়দের মধ্যে এই দান অনুমোদিত হয়। যদিও এইক্ষেত্রে কিছু আইনি জটিলতা রয়েছে।
অন্য দিকে, মৃত মানুষের শরীর থেকে সব ক’টি অঙ্গই প্রতিস্থাপনের জন্য সংগ্রহ করা যায়।মরণোত্তর অঙ্গদানে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে গেলে প্রথমে ইচ্ছুক ব্যক্তিকে নোটো (NOTTO) বা (ROTTO) এই দুইয়ের মাধ্যমে নাম নথিভুক্ত করতে হয়। এক্ষেত্রে পরিবারের অনুমতি বাধ্যতামূলক। এই প্রতিষ্ঠানে আবেদনের ভিত্তিতেই সবকিছু ঠিক হয়।
Sponsored

Sponsored

Sponsored

Sponsored












