হৃদযন্ত্রের ছন্দপতন শব্দটা শুনতে বেশ শৈল্পিক মনে হলেও আদতে এটি বিপজ্জনক এক শারীরিক অবস্থা। চিকিৎসার পরিভাষায় একে বলা হয় ‘কার্ডিয়াক অ্যারিথমিয়া’। অ্যারিথমিয়ার (Arrhythmia ) তেমন উপসর্গ থাকে না সেই কারণেই জরুরি সচেতনতা। কেন হয় অ্যারিথমিয়া? এই রোগের চিকিৎসা কী? জটিলতাই বা কী? এই নিয়ে বিস্তারিত লিখলেন শর্মিষ্ঠা ঘোষ চক্রবর্তী।
অ্যারিথমিয়া আসলে কী
Sponsored

বুকের মাঝে চলতে থাকা ধুকপুক আওয়াজটির যদি কোনও কারণে ছন্দপতন ঘটে তাহলে কিন্তু ভারী বিপদ। কখনও দ্রুত আবার কখনও ধীর হার্টবিট যখন এমনতর ভারসাম্যহীন তখন সতর্কতা জরুরি। সময়ে ধরা না পড়লে জটিলতা বাড়তে সময় লাগবে না। কারণ চিকিৎসার পরিভাষায় একে বলা হয় ‘কার্ডিয়াক অ্যারিথমিয়া’। চিকিৎসকেরা বলছেন এটা এমন এক অবস্থা যেখানে হৃদযন্ত্র খুব দ্রুত এবং অনিয়মিত ভাবে স্পন্দিত হয়। যাকে সহজ কথায় বলা যায় বুক ধড়ফড় করা। এই বুক ধড়ফড়ানি এত তীব্র আকারে হয় যে রোগী অজ্ঞান পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। তবে এই হার্টের অসুখটি সঠিক চিকিৎসায় নিরাময়যোগ্য।
হৃৎপিণ্ড সাধারণত একটি স্থির ও সুশৃঙ্খল ছন্দে স্পন্দিত হয়। ওই স্বাভাবিক ছন্দ থাকাটা খুব জরুরি, কারণ হার্ট যে রক্ত পাম্প করে তার মাধ্যমে আপনার সারা শরীরে পুষ্টি ও অক্সিজেন সরবরাহ হয়। অস্বাভাবিক ছন্দ বা ইরেগুলার হার্টবিট থাকলে এই প্রক্রিয়া বাধাপ্রাপ্ত হয়। সমীক্ষা বলছে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৫ জনের অ্যারিথমিয়া থাকতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোনও উপসর্গ থাকে না ফলে ধরা পড়ে না। আট্রিয়াল ফাইব্রিলেশন হল সবচেয়ে সাধারণ অ্যারিথমিয়া। কিছু ধরনের অ্যারিথমিয়া আছে যা ক্ষতিকর নয় তবে কিছু বিশেষ ধরনের অ্যারিথমিয়া রয়েছে যা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় অনেকটাই।
অ্যারিথমিয়ার ধরন
সুপ্রাভেন্ট্রিকুলার অ্যারিথমিয়া: এর শুরু হয় হৃৎপিণ্ডের উপরের প্রকোষ্ঠে।
ভেন্ট্রিকুলার অ্যারিথমিয়া : এটি শুরু হয় হৃৎপিণ্ডের ভেন্ট্রিকল বা নীচের প্রকোষ্ঠ থেকে।
ব্র্যাডি অ্যারিথমিয়া এবং জাংশনাল রিদম : হৃৎপিণ্ডের সঞ্চালন ব্যবস্থার সমস্যার কারণে এটা হতে পারে।
অ্যারিথমিয়ার লক্ষণ
অনিয়মিত হৃৎস্পন্দনের কোনও লক্ষণ প্রকাশ পায় না। তবে কিছু উপসর্গ থাকে যেমন—
- বুক ধড়ফড়ানি।
- খাবার খেতে অসুবিধে হওয়া।
- মাথা ঘোরা বা হালকা মাথা ব্যথা।
- হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
- ছোটদের অ্যারিথমিয়া থাকলে খুব খিটখিটে ভাব আসে। ঘ্যানঘ্যান করে তাঁরা।
- প্রবল শ্বাসকষ্ট।
- বুকের মধ্যে একটানা অস্বস্তি।
- দুর্বলতা এবং ক্লান্তি।
- অ্যারিথমিয়ার কারণ
বেশিরভাগ অ্যারিথমিয়া হৃৎপিণ্ডের ধমনী, ভালভ বা পেশির সমস্যার কারণে হয়ে থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক এবং শিশুদের উভয়েরই অ্যারিথমিয়ার দেখা দেয়।
করোনারি ধমনী রোগ বা করোনারি আর্টারি ডিজিজ হলে।
উচ্চরক্তচাপ থাকলে হতে পারে।
হার্টের পেশির দুর্বলতা (কার্ডিওমায়োপ্যাথি) থাকলে।
ভালভের সমস্যা থাকলে হয়।
রক্তে ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিলে হয়।
হার্ট-অ্যাটাকজনিত সমস্যা থাকলে হতে পারে।
হার্ট সার্জারির পর নিরাময় প্রক্রিয়া থেকে অ্যারিথমিয়া দেখা দিতে পারে।
বংশগত কোনও সমস্যা থাকলে হয়।
Sponsored

কিছু নির্দিষ্ট ওষুধের প্রভাবে হতে পারে, যেমন শিশুদের গুরুতর অসুস্থতা থেকে কোনও ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে হয়।
জ্বর, সংক্রমণ, জলশূন্যতা, মানসিক চাপ, প্রদাহ বা ঘুমের অভাব থেকেও হয়।
Sponsored

জীবনযাত্রায় কখন অ্যারিথমিয়ার ঝুঁকি
তামাকজাত দ্রব্যের বেশি ব্যবহার।
Sponsored

অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান।
Sponsored

ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এবং খাবার গ্রহণ করা।
সর্দি-কাশির ওষুধ বা কোনও নির্দিষ্ট ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিকের প্রভাব।
থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে ঝুঁকি বেশি।
অতিরিক্ত ওজন থাকলে।
রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি হলে ঝুঁকির হতে পারে।
স্লিপ অ্যাপনিয়া থাকলে হতে পারে।
অ্যারাথমিয়ার ঝুঁকি কমানোর উপায়
তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার বন্ধ করুন।
মদপান সীমিত করা।
ক্যাফেইন ব্যবহার সীমিত করা বা বন্ধ করা। এর মধ্যে চা, কফি, কোলা এবং কিছু প্রেসক্রিপশন ছাড়া কেনা যায় এমন ওষুধও অন্তর্ভুক্ত।
উত্তেজক পদার্থ গ্রহণ না করা। বেশি কাশি ও সর্দির ওষুধ খাওয়া।
উচ্চরক্তচাপ থাকলে তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
স্লিপ অ্যাপনিয়া থাকলে চিকিৎসা জরুরি।
অতিরিক্ত মানসিক উত্তেজনা, ক্রমাগত চলতে থাকা স্ট্রেস, অ্যাংজাইটি এড়িয়ে চলুন।
নিয়মিত শারীরিক কসরত বা ব্যায়াম খুব জরুরি।
অ্যারিথমিয়ার জটিলতা
চিকিৎসা ছাড়া, হৃৎযন্ত্রের অনিয়মিত ছন্দের কারণে নিম্নলিখিত জটিলতাগুলো দেখা দিতে পারে যেমন
হৃদ্ পেশির দুর্বলতা (কার্ডিওমায়োপ্যাথি)
হার্ট ফেইলিওর হতে পারে।
হৃদ্ যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হতে পারে।
স্ট্রোক হতে পারে।
আকস্মিক শিশু মৃত্যু বা সাডেন ডেথ হতে পারে।
পরীক্ষানিরীক্ষা
অ্যারিথমিয়া রয়েছে কি না তা জানতে কিছু পরীক্ষানিরীক্ষা খুব জরুরি। মূলত চিকিৎসকেরা যেগুলো দেন সেগুলো হল—
- ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম (ECG বা EKG)
- কিছু রক্ত পরীক্ষা
- হার্ট মনিটরিং করানো বা হল্টার মনিটরিং
- স্ট্রেস টেস্ট
- ইকোকার্ডিওগ্রাম
- কার্ডিয়াক ক্যাথেটারাইজেশন
- ইলেক্ট্রোফিজিওলজি স্টাডি (ইপিএস)
- টিল্ট টেবিল পরীক্ষা
- সিটি স্ক্যান
- হার্ট এমআরআই
চিকিৎসা
আপনার হৃদ্স্পন্দনের ধরন ও তীব্রতার উপর হার্ট অ্যারিথমিয়ার চিকিৎসা নির্ভর করে। অনেক সময় প্রাথমিক হালকা কিছু ক্ষেত্রে কোনও চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। গুরুতর ক্ষেত্রে মূল চিকিৎসায় হার্টের গতি নিয়ন্ত্রণে ওষুধ দেন চিকিৎসক। কারও কারও এতেই হৃদস্পন্দন ঠিক করতে কার্ডিওভারশনএগুলো অ্যারিথমিয়ার দুটো ভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতির নাম।
কার্ডিভারশন (বুকে ছোট বৈদ্যুতিক শক বা ওষুধের মাধ্যমে হৃৎপিণ্ডের স্বাভাবিক ছন্দ দ্রুত ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া)। ক্যাথেটার অ্যাবলেশন (রক্তনালির ভেতর দিয়ে সরু নল বা ক্যাথেটার পাঠিয়ে ত্রুটিপূর্ণ হার্ট টিস্যু ধ্বংস করে স্থায়ীভাবে অস্বাভাবিক সংকেত বন্ধ করা) এবং স্থায়ীভাবে গতি ঠিক রাখতে পেসমেকার বা আইসিডি (ICD) যন্ত্র স্থাপন করতে হয়। এর সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার পরিবর্তন জরুরি। কিছুক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার করতে হয়।
অ্যারিথমিয়া কখন মারণ
অ্যারিথমিয়া হয়ে যেতে পারে জীবনঘাতী। এটি হার্ট পাম্প করতে ব্যর্থ হলে হঠাৎ হতে পারে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট। দীর্ঘস্থায়ী হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের বংশগত ইতিহাস থাকলে এর ঝুঁকি দশগুণ বেড়ে যায়।
ভেন্ট্রিকুলার ফাইব্রিলেশন (VF): এতে হৃৎপিণ্ডের প্রকোষ্ঠগুলি বিশৃঙ্খলভাবে কাঁপে এবং রক্ত পাম্প করা বন্ধ করে দেয় এবং মৃত্যু হতে পারে।
ভেন্ট্রিকুলার টাকিকার্ডিয়া (VT): হৃদ্ স্পন্দন অত্যন্ত দ্রুত হয়ে গেলে এবং আগে থেকেই যদি হৃদপিণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত বা দুর্বল হয় তাহলে মারাত্মক আকার ধারণ করে।
আগে থেকে হৃদ্ রোগের উপস্থিতি: অতীতে হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকলে বা কনজেস্টিভ হার্ট ফেইলিওর থাকলে সামান্য অনিয়মিত স্পন্দনও প্রাণঘাতী হতে পারে।
বংশগত ঝুঁকি : ব্রুবাডা সিন্ড্রোম বা লং কিউটি সিন্ড্রোম এর মতো জিনগত সমস্যা থাকলে হঠাৎ প্রাণহানির ঝুঁকি থাকে।
বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট : অনিয়মিত স্পন্দনের সঙ্গে যদি তীব্র বুকে ব্যথা, মারাত্মক শ্বাসকষ্ট বা হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে তবে জীবনহানি হতে পারে।











