কে ভোজিনা ? কে বুবিস্তা ? কেপ ভার্দে কী ? মাত্র সাড়ে পাঁচ লক্ষ মানুষ নিয়ে আটলান্টিকের পারে আফ্রিকার উপকূলে এক ছোট্ট দেশ কেপ ভার্দে বা কাবো ভার্দে ( Cabo Verde, Cape Verde ) দশটি অপরূপ দ্বীপের সমাহার।
এখন বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র। সারা পৃথিবী আসে এখানে। এই ছোট্ট দেশের জাতীয় দলের গোলকিপার ভোজিনা। বয়স চল্লিশ। খেলা ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু দলের কোচ এবং সতীর্থদের জোরাজুরিতে, আসলে দেশের ডাকে, জন্মভূমির টানে আবার ফিরে এসেছেন এবং এসেই সারা বিশ্বের নজর কেড়েছেন অসাধারণ কয়েকটি সেভ করে। এখন তিনি ফুটবল ইতিহাসের এক চিরস্থায়ী অংশ।
আর বুবিস্তা হলেন ভোজিনাদের কোচ, যিনি না থাকলে আজ কেউ চিনতো না এই ক্ষুদ্র দেশটিকে। অজানা অচেনা কাবো ভার্দের এই চমকপ্রদ উত্থান একেবারে রূপকথার মতো।
চলতি ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে এখনও পর্যন্ত কোনো ম্যাচ জেতে নি এই দেশটি। আবার হারেও নি। প্রথম রাউন্ডে পরপর তিনটি ম্যাচ ড্র করে স্বপ্নের মতো পৌঁছে গেছে দ্বিতীয় রাউন্ডে। এবার মুখোমুখি হতে হবে বিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনার। তাহলে কি ভয় পাচ্ছে কেপ ভার্দে? একটুও না। কোচ বুবিস্তা বলেছেন, " ফুটবলে কিছুই অসম্ভব নয়। "
সত্যিই তো। অসম্ভবকে সম্ভব করার মন্ত্র না জানলে এতোদূর এলো কীভাবে নামগোত্রহীন এই দেশ ?
আজ থেকে ছ'শো বছর আগে পর্তুগিজ অভিযাত্রীদের আবিষ্কার করা এই দ্বীপপুঞ্জ এককালে আফ্রিকার ক্রীতদাসদের কেনাবেচার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কেপ ভার্দে স্বাধীন হয় ১৯৭৫ সালে।
এবারের বিশ্বকাপে স্পেন, উরুগুয়ে, সৌদি আরব ও কেপ ভার্দে ছিল একই গ্রুপে। স্পেনের সঙ্গে গোলশূন্য ড্রয়ের পরও কেউ পাত্তা দেয় নি এই ছোট্ট দেশটিকে। সবাই হয়তো ভেবেছিলেন একটা অঘটন ঘটে গেছে যা প্রতিদিন ঘটে না। তারপর উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ২--২ , শেষে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে আবার গোলশূন্য ড্র। এরপরও নক আউট পর্বে পৌঁছোনোর ক্ষেত্রে বাধা ছিল সামান্য। কিন্তু স্পেন উরুগুয়েকে হারিয়ে দিতেই কেটে যায় সব বাধা। ভাবা যায়, কেপ ভার্দের আগমন, উরুগুয়ের বিদায়! ফুটবলে কিছুই অসম্ভব নয়।
ফুটবল থেকে সন্ন্যাস নিয়ে ফেলা তথাকথিত এক মামুলি গোলরক্ষক ভোজিনা দুরন্ত স্পেনের বিরুদ্ধে প্রায় ৭ টি নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে দলের তো বটেই, রাতারাতি দেশের নায়ক হয়ে ওঠেন। ভোজিনা এখন অটল এক প্রত্যয়ের নাম। দেশের জন্য দুরন্ত সংগ্রামের নাম। আর কোচ বুবিস্তা?
বছরের পর বছর ধরে এই দ্রোণাচার্য নিজের দেশের নাম বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে আনার জন্য নিরন্তর লড়াই চালিয়ে গেছেন নীরবে। এ যেন এক অন্তর্লীন প্রতিজ্ঞা, এক ইস্পাত কঠিন অঙ্গীকার।
বিশ্বকাপের জন্য নির্বাচিত কেপ ভার্দের জাতীয় দলের ২৬ জন ফুটবলারদের সকলেই থাকেন দেশের বাইরে। এঁরা সবাই জন্মসূত্রে কেপ ভার্দের সঙ্গে জড়িত হলেও বর্তমানে প্রত্যেকেই বিদেশে বসবাসরত। এঁদের সকলকে নির্বাচিত করে একসূত্রে গাঁথার দুরুহ কাজটি নিপুণ দক্ষতায় করেছেন বুদ্ধিমান কোচ বুবিস্তা। ইনিই আজকের এই সাফল্যের মূল কারিগর।
কোচ বুবিস্তা বলেছেন একতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ ছাড়া একটা সুখী সংসার গড়ে তোলা অসম্ভব, আর সুখী সংসার ছাড়া সাফল্যকে ছোঁয়া যায় না। তিনি দেশের ফুটবলারদের ভাবতে শিখিয়েছেন যে, ফুটবলে ছোট-বড়ো বলে কিছু হয় না, বরং এমন কিছু করতে হবে যাতে পৃথিবীর যত ছোট দেশ আছে তারা কেপ ভার্দেকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়।
বুবিস্তার আসল নাম পেদ্রো লেইতাও ব্রিটো। মারাদোনা যাঁর স্বপ্নের নায়ক, সেই মারাদোনার দেশের বিরুদ্ধে খেলার জন্য এখন মুখিয়ে আছেন বুবিস্তা। কী হবে সেদিন?
ফিফার বিচার অনুযায়ী এখন ৬৭ তম স্থানে রয়েছে কেপ ভার্দের জাতীয় ফুটবল দল। উরুগুয়ের বিরুদ্ধে দেশের দুই গোলদাতার নাম কে পিনা এবং এইচ ভারেলা। দুটি গোলই অসামান্য। সিমিডো, দার্তে, মন্টেরিও, লিভ্রামেন্টো, মেন্ডিস, বোর্জেস, লোপেজ ও পাউলো সমৃদ্ধ কাবো ভার্দে এখন গোটা বিশ্বের সম্ভ্রম আদায় করে নিচ্ছে তাদের দুরন্ত ফুটবলের দৌলতে। কে জানে জুলাইয়ের ৪ তারিখ তাদের রথের চাকা বসে যাবে, নাকি আবার এক বৃহৎ অঘটন ঘটিয়ে তারা একেবারে হতচকিত করে দেবে বিশ্বকে ! ইতিবাচক অঘটন সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করে সবসময়। সেই আশায় সম্ভবত বুক বাঁধছে দুনিয়ার অসংখ্য ছোট ছোট ফুটবলপাগল দেশ।















