নৈতিকতার স্খলন দেখেও
'ফুটবল নৈতিকতা', উৎপল সিনহার কলম
Sponsored

মানবতার পতন দেখেও
নির্লজ্জ অলসভাবে
বইছো কেন ...
পেনাল্টি পেয়েও পেনাল্টির সুযোগ নিচ্ছে না একটা দল , এমন কখনও শুনেছেন কি ? বক্সের মধ্যে বিপক্ষ ডিফেন্ডারের হাতে লেগেছে বল কিংবা ফাউল করেছেন বিপক্ষের ফুটবলার, তাই পেনাল্টি দিয়েছেন রেফারি, এমন তো কতোই ঘটে।
যাঁদের বিরুদ্ধে পেনাল্টি, তাঁরা ঘিরে ধরেন রেফারিকে, প্রতিবাদ জানান , হালকা ফাউল অথবা অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির দোহাই দিয়ে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা ও প্রত্যাহারের আবেদন জানান, কিন্তু রেফারি তাঁর সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। এমতাবস্থায় পেনাল্টি পাওয়া দলটি অপেক্ষা করতে থাকে সুযোগটি কাজে লাগানোর জন্য।
তবে এর ব্যতিক্রমও দেখা যেতো একসময়। রূপকথা মনে হলেও মোটেও রূপকথা নয়। ইউরোপের কোন এক ফুটবলপাগল দেশের বিখ্যাত এক ফুটবল দল নিজেদের দলের শক্তি নিয়ে এতটাই আত্মপ্রত্যয়ী ছিল যে, কোনো অন্যায্য অথবা পড়ে পাওয়া সুযোগ গ্রহণ করতো না। শুধু জয় নয়, খেলায় নৈতিকতা রক্ষা ছিল তাদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।
তাহলে অন্যায্য পেনাল্টি পেলে তারা কী করতো ? তারা পেনাল্টি শটটা হয় গোলকিপারের হাতে তুলে দিতো কিংবা বাইরে মারতো। তারপর কপাল চাপড়ে হতাশা প্রকাশ করতো, কারণ ইচ্ছাকৃত পেনাল্টি নষ্ট অপরাধ এবং তা ম্যাচ ফিক্সিংয়ের মতোই মারাত্মক। রেফারি বুঝতে পারলে জরিমানা ও কয়েক ম্যাচের নির্বাসন অবধারিত।
নেদারল্যান্ডসের ফুটবল দল পি এস ভি আইন্ডহোভেন নাকি এককালে এই নৈতিকতার দর্শন মেনে ফুটবল খেলতো। আবার ফুটবল সম্রাট পেলের প্রিয় দল ব্রাজিলের স্যান্টোস ক্লাবও নাকি এককালে এই নৈতিকতা মেনে চলতো। আজ সবই রূপকথা মনে হয়। কেননা আজকের ফুটবলে যেন-তেন-প্রকারেণ জয়ই একমাত্র কাম্য। ছলে বলে কৌশলে যেভাবে হোক জয় চাই। তবু যেন কোথাও একটা সততা আজও বেঁচে আছে, নইলে ন্যায্য আর অন্যায্য নিয়ে তুমুল তর্ক আজও হয় কেন ?
দিয়েগো মারাদোনার কথাই ধরা যাক। ফুটবলের এই জাদুকর তাঁর অসামান্য নৈপুণ্যে সারা পৃথিবীকে বারবার মুগ্ধ করেছেন । কিন্তু বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে হাত দিয়ে করা তাঁর সেই ( Hand of God ) কুখ্যাত গোলটি দেখলে প্রিয় মারাদোনাকেও মনে হয় প্রতারক। শুধু ফুটবল নয়, যে কোনো খেলায় নৈতিকতা তথা সততা এতটাই কাঙ্খিত।দৌড়বীর বেন জনসনকে নিশ্চয়ই মনে আছে ! কী অসাধারণ ছিল তাঁর সেই বিদ্যুৎ চমকের মতো দৌড়! মাত্র কয়েক সেকেন্ডে ১০০ মিটার ছুঁয়ে ফেলতেন। কার্ল লুইসের মতো সর্বকালের সেরা স্প্রিন্টারকে ম্লান করে দিয়ে অলিম্পিকে সোনা জিতেছিলেন। আরও অজস্র পদক জেতেন জনসন। কিন্তু তাঁর শেষ পরিণতি কী হয়েছিল ?
যেদিন বেন ধরা পড়লেন ড্রাগ টেস্টে, সেদিনই তাঁর সমস্ত পদক কেড়ে নেওয়া হলো। নৈতিকতার পতন তাঁকে হিরো থেকে জিরো বানিয়ে দিলো এক মুহূর্তে !
আসলে যে কোনো খেলার স্পিরিটের মূল ভিত্তি নৈতিকতা। নৈতিকতার স্খলন খেলার স্পিরিটটাই নষ্ট করে দেয় নিমেষে। ছড়াতে থাকে ঘুণপোকার মতো। দুরারোগ্য ব্যাধির মতো গ্রাস করতে থাকে খেলার জগতটাকে। যা সভ্যতার পক্ষেও বিরাট বিপজ্জনক।
আজ থেকে মাত্র চার দশক আগেও ফুটবলে জয় পরাজয়ের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো ভালো খেলাটাকে। দৃষ্টিনন্দন শিল্পময় ফুটবল দেখতে চাইতেন সবাই। প্রাণপণ লড়াই করে হেরে গেলেও পরাজিত দল বীরের সম্মান পেতো। সেই ব্রাজিলের কথা ভেবে দেখুন, যে দলে খেলতেন জিকো , সক্রেটিস প্রমুখ শিল্পীরা ! কিন্তু আজ দিন বদলের হাত ধরে পাল্টে গেছে ফুটবলারদের আচরণ এবং মানসিকতা। যেভাবে হোক ম্যাচ জেতাটাই এখন শেষ কথা।
Sponsored

Sponsored

Sponsored

Sponsored












