" ... সময় কেবলই নিজ নিয়মের মতো -- তবু কেউ সময়স্রোতের 'পরে সাঁকো বেঁধে দিতে চায় ; ভেঙে যায়, যত ভাঙে তত ভালো। "
'সালভাদোর দালি', উৎপল সিনহার কলম
Sponsored

স্থির ছবিকে হাঁটাতে চেয়েছিলেন পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। ছবি কি কখনও হাঁটে, নড়েচড়ে? জল পড়লে ছবির পাতা কি নড়ে ?
ছবির পাতা ? এ আবার কি আজগুবি কথা ? তবে পদাতিক কবির স্থির ছবিকে হাঁটাতে চাওয়ার মধ্যে রয়েছে এক অতি দুরুহ সঙ্কেত। কবি তো ইঙ্গিত করবেনই , সঙ্কেতও দেবেন। তবে যাঁরা ছবি আঁকেন, তাঁরা ছবিকে কথা বলানোর চেষ্টা করেন সর্বাগ্রে। ছবি অজস্র কথা বলে । অনর্গল, অফুরান কথা। হৃদয়ের বেদনার কথা, সান্ত্বনার নিভৃত নরম কথা। আমরা ঘুমিয়ে পড়ি। ছবির ঘুম নেই। তার শুধু জাগরণ। জাগরণে যায় বিভাবরী। ছবির ঘুম হরণ করেন স্বয়ং ছবিকার, চিত্রকর । লিয়োনার্দো দা ভিঞ্চি থেকে ভ্যান গগ, মকবুল ফিদা থেকে গনেশ পাইন ছবিতে, তাঁদের অসংখ্য চিত্রকলায় করে যান নীরব চিৎকার। চিত্রকর নির্বাপিত হন , রেখে যান সৃষ্টি, যা অনির্বাণ। কখনো কখনো এমনও দেখা যায় তাঁদের কিছু কিছু সৃষ্টি এমনই নির্লিপ্ত, এতটাই নির্বিকার আর এমনই নৈর্ব্যক্তিক যে,
প্রশ্ন ওঠে আমাদের বিচলিত মনে, ' ও শিল্পী, তোমার কি হৃদয় নাই ? ' এসব প্রসঙ্গ উঠলেই মৃদু হেসে এসে দাঁড়ান প্রিয় শিল্পী সালভাদোর দালি।
তিনি নাকি সময়কে ছুঁড়ে ফেলতে চেয়েছেন। আসলেই কি চেয়েছেন ? বিজ্ঞানীরা বলেন, যখন আর মানুষ থাকবে না পৃথিবীতে, তখনো সময় থাকবে। সময়ের মৃত্যু নেই।
মানব নির্বাপিত হবে কিন্তু সময় অনির্বাণ। কিন্তু তাতে কার লাভ ? মানুষই যদি না থাকে তাহলে সময় গুনবে কে, কারা? তাই কি সময় থাকতেই সময়কে অবজ্ঞা করা শুরু করেন স্প্যানিশ পরাবাস্তব শিল্পী সালভাদোর দালি ?
তাঁর সেরা শিল্পকর্ম ' দ্য পারসিস্টেন্স অফ মেমোরি ' ( ১৯৩১ ) গলে যাওয়া নরম পকেট ঘড়ির প্রতীকী চিত্র। এই নরম তুলতুলে ঘড়িগুলো সময়কে অনমনীয় বা নিয়তিবাদী বলে ধরে নেওয়ার ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে রীতিমত বিদ্রুপের সঙ্গে।
' The persistence of memory ' অর্থাৎ ' স্মৃতির স্থায়ীত্ব ' চিত্রের সৃষ্টিকাল ১৯৩১ সাল। এই যে চিত্রটির জন্মসময় আমরা জেনে নিতে পারছি, এটার তাহলে দরকার নেই ?
' স্থান- কাল- পাত্র ' থেকে ' কাল ' যদি বিদায় নেয়, তাহলে সমস্ত তথ্য কি পঙ্গু হয়ে যায় না ?
দালি বলছেন, এসব তথ্য রেখে কী লাভ ? 'স্মৃতির স্থায়ীত্ব ' ছবিটি খুঁটিয়ে দেখতে থাকলে একটা অদ্ভুত ঘোর লেগে যায়, সমস্ত প্রশ্ন যেন কিছুক্ষণের জন্য সম্পূর্ণ উবে যায় মন থেকে। কি আশ্চর্য এক সৃষ্টি !
' My best ideas com ( e ) through my dreams ' , আমার সেরা ভাবনাগুলো আসে স্বপ্নে , বলে গেছেন সালভাদোর দালি। মনে রাখতে হবে, দালির চিত্রকলার অন্যতম সেরা চরিত্র হয়ে উঠেছে ঘড়ি, তাও আবার নির্জন সমুদ্র সৈকত সাক্ষী রেখে। ক্লাসিক্যাল, ইম্প্রেশনিজম , কিউবিজম , ফিউচারিজম ইত্যাদি বিভিন্ন শৈলীর প্রতি আগ্রহ থেকেই তিনি ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন সম্পূর্ণ নতুন এক সৃজন শৈলী, যা মেটাফিজিক্যাল পেইন্টিংয়ের স্তর অতিক্রম করে সৃষ্টি করে এমন এক সুররিয়ালিস্টিক আবহ, শিল্পকলার ইতিহাসে তা শুধুমাত্র বিস্ময়করই নয়, এর প্রভাবে বিংশ শতাব্দীর চিত্রকলায় খুলে যায় এক নূতন দিগন্ত। একটা নতুন জগৎ, একটা অদ্ভুত আলো-আঁধার অনুভূতি, একটা স্বপ্নময় মায়াজগৎ, যা একইসঙ্গে যুক্তির অতীত এবং কালাতীত।
ঘড়িগুলো ছাড়া আর কি কি রয়েছে এই কালজয়ী ছবিতে ? রয়েছে সমুদ্রতীর, দূরে পাহাড়, আরও দূরে আকাশ। এখানে সময় যেন বিলুপ্ত কোনো প্রাণী। সময় ঝুলে পড়েছে কাপড়ের মতো। গলে পড়েছে মাখনের মতো। কালো পিঁপড়েদের আক্রমণে সময় এখানে দংশিত।এ ছবি দেখতে দেখতে বিভোর মনে কখন যেন এসে দাঁড়ান নির্জন কবি জীবনানন্দ। তাঁর আবহমান অখণ্ডকাল যেন এসে দাঁড়ায় কবির পাশে। নিরুচ্চার প্রশ্নমালা ভেসে বেড়ায় ইথার তরঙ্গে ।
তাহলে কি ইতিহাসচেতনা, সময়চেতনা ইত্যাদি একেবারেই মূল্যহীন ? জীবনানন্দ কবি লিখেছেন ,' আবহমান ইতিহাসচেতনা একটি পাখির মতো যেন ' ।
এ ছবির সূচনা ডাইনিং টেবিলে। মাখনের মতো সময়ের গলে পড়ার উৎস কি ? ফ্রান্সের বিখ্যাত পনির ক্যামোবের। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড উষ্ণতায় পনির নরম হয়ে এসেছিল। সাদা গলিত পনিরের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দালির মনে হলো সময় তো এভাবেই চলছে, গলে পড়ছে, রূপান্তরিত হচ্ছে, এও তো এক মেটামরফসিস ! এভাবেই স্বপ্নে নয়, জাগরণেই এলো প্রতীকী ভাবনা। রূপ পেলো চিত্রকর্মে । ক্রমে গলিত পনিরের জায়গায় উপস্থিত হলো ঘড়িগুলো। এই ঘড়িগুলো কোনো সদর্থক ইঙ্গিত দেয় না। এ ছবিতে নাটকীয়তা রয়েছে যথেষ্ট। ঘড়ির যে গোলাকার ডায়াল, যা সময়চক্রকে ধরে রাখে, তা এখানে ভেঙে পড়েছে। যেখানে বৃত্ত রয়েছে সেখানেও পিঁপড়েদের দংশনে সব সংখ্যা মুছে গেছে । ১০টা বাজলো নাকি ১২টা , কিছুই বোঝা যায় না। ক্রমাগত দংশনে ঘড়ির সর্বাঙ্গ রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত। আরেকটা ঘড়িতে মাছি বসেছে। সেই ঘড়ির ভেতরকার নীল জল পান করছে মাছি ! সময় এখানে নিরুদ্দেশ হবার অপেক্ষায়।
রাত কত হলো ? উত্তর মেলে না এখানেও ।
বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দূরাভিসারী সালভাদোর দালি এভাবেই এক অনন্ত বিস্ময় রেখে গেছেন আমাদের জন্য।
Sponsored

Sponsored

Sponsored

Sponsored












