এআই (AI) যত শক্তিশালী হচ্ছে, ততই কি বাড়ছে বিপদের আশঙ্কা? এই প্রশ্নটাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বিশ্বজুড়ে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে, এ নিয়ে সতর্ক হওয়ার কথা বলছেন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এআই সংস্থাগুলির মাথা। স্পেসএক্সের (SpaceX) কর্ণধার ইলন মাস্ক (Elon Musk), ওপেনএআই-এর (OpenAI)  সিইও স্যাম অল্টম্যান (Sam Altman) এবং অ্যানথ্রপিকের (Anthropic)  প্রধান দারিয়ো আমোদেই (Dario Amodei)। এআই-এর ক্ষমতা বাড়তেই পারে, কিন্তু সেই দৌড় যেন নিরাপত্তার ব্যবস্থাকে পিছনে ফেলে না যায়।

এই বিতর্কে সবচেয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন অ্যানথ্রপিকের সিইও দারিয়ো আমোদেই। শনিবার প্রকাশিত একটি দীর্ঘ প্রবন্ধে তিনি জানিয়েছেন, এআই প্রযুক্তি এত দ্রুত বদলাচ্ছে যে গবেষক এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের হাতে সম্ভাব্য বিপদগুলি বোঝা ও সামলানোর জন্য প্রয়োজনীয় সময়টুকুও থাকছে না। তাই তাঁর পরামর্শ, এআই উন্নয়নের গতি কিছুটা কমানো দরকার। তবে তার অর্থ প্রযুক্তির অগ্রগতি থামিয়ে দেওয়া নয়। বরং তাঁর যুক্তি, অগ্রগতি চলবে, কিন্তু তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তা পরীক্ষার সুযোগও তৈরি করতে হবে। আমোদেইয়ের মতে, শুধু এআই নিরাপত্তা নিয়ে বেশি অর্থ খরচ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। অত্যাধুনিক মডেলগুলি যে গতিতে আরও ক্ষমতাশালী হয়ে উঠছে, সেই গতির সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও এগোতে হবে। 

আরও পড়ুন: রাজ্যে দুই কেন্দ্রে উপনির্বাচনে লড়াই হবে জোড়াফুল প্রতীকেই, সাফ জানালেন কল্যাণ

আমোদেইয়ের এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পরই সমর্থন জানিয়েছেন ইলন মাস্ক ও স্যাম অল্টম্যান। মাস্কের মন্তব্য, আমোদেই যথার্থ কথাই বলেছেন। অন্য দিকে, অল্টম্যান এআই মডেল যাচাইয়ের ক্ষেত্রে স্বাধীন মূল্যায়নকারীদের আরও বেশি সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ওপেনএআইও এমন ব্যবস্থা চালুর পথে এগোবে।

কিন্তু কেন হঠাৎ এআই-এর গতি নিয়ে এতটা উদ্বেগ? আমোদেইয়ের চিন্তার পিছনে অন্যতম কারণ এআই-এর নিজের ক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনা। ভবিষ্যতের এআই সিস্টেম মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজেদের আরও উন্নত সংস্করণ তৈরিতে সাহায্য করতে পারে। প্রযুক্তির ভাষায় যাকে বলা হয় ‘রিকার্সিভ সেল্ফ-ইমপ্রুভমেন্ট’। এই ক্ষমতা যত বাড়বে, ততই নিয়ন্ত্রণ হাতের বাইরে চলো যাবে।

এর সঙ্গে আরও একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন আমোদেই। গত জুলাইয়ে এআই সফ্‌টওয়্যার সংস্থা ‘হাগিং ফেস’-কে ঘিরে একটি হ্যাকিংয়ের ঘটনা সামনে আসে। সেখানে ওপেনএআই-এর একটি পরীক্ষামূলক পরিবেশ থেকে বেরিয়ে যাওয়া প্রায় ১২০০টি এআই এজেন্টের একটি দল হামলায় যুক্ত হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। পরীক্ষামূলক এআই সিস্টেমগুলি অনলাইনে এমন কিছু কার্যকলাপ চালিয়েছিল, যার সবটা তাদের নির্মাতা সংস্থাগুলির কর্তাদের নজরে আসেনি। অ্যানথ্রপিকের তৈরি সিস্টেমও সেই পরীক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: কলমেই বিপ্লবের ডাক, ১০০ বছর পরেও অমলিন শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’

এই ঘটনাই আমোদেইয়ের আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়েছে। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে যদি আরও শক্তিশালী এআই সিস্টেম একই ভাবে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে এবং মানুষের নজর এড়িয়ে অনলাইনে নানা কাজ চালাতে পারে, তাহলে পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

এআই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ অবশ্য শুধু আমোদেইয়ের নয়। প্রযুক্তি ক্ষেত্রের একাধিক গবেষকও মনে করছেন, ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে এআই-এর সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা এবং নিরাপত্তা পরীক্ষাকে আরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। তবে এখানেই আসল প্রশ্নটি আরও কঠিন। এআই-এর গতি কি সত্যিই কমানো সম্ভব?

এক পক্ষের যুক্তি, প্রযুক্তির অগ্রগতিকে আইন করে থামানো প্রায় অসম্ভব। যে সংস্থা ধীর হবে, অন্য কোনও সংস্থা বা দেশ হয়তো এগিয়ে যাবে। ফলে প্রতিযোগিতার বাজারে পুরোপুরি ‘ধীরে চলো’ নীতি কার্যকর করা কঠিন।

অন্যদিকে আরেক পক্ষ বলছে, প্রযুক্তিকে থামানো লক্ষ্য নয়, তার ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা মূল লক্ষ্য। যেমন গাড়ির গতি পুরোপুরি বন্ধ করা হয় না। বরং স্পিড লিমিট, ব্রেক এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়, যাতে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা কমে। এআই নিয়েও একই পদ্ধতি নেওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। অর্থাৎ, এআই যত দ্রুত শক্তিশালী হবে, তার নিরাপত্তা পরীক্ষা, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং ঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষমতাও অন্তত সেই গতিতেই বাড়াতে হবে।

আর ঠিক এই জায়গাতেই আমোদেইয়ের বার্তা, এআই-এর দৌড় থামানোর কথা নয়, কিন্তু দৌড়টা যেন এত দ্রুত না হয় যে নিরাপত্তার দল পিছনে পড়ে যায়। আর সেই সতর্কবার্তায় এবার সুর মিলিয়েছেন মাস্ক ও অল্টম্যানও। এআই দুনিয়ার তিন প্রতিদ্বন্দ্বী শিবির থেকে একই ধরনের বার্তা আসা তাই নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।