শর্মিষ্ঠা ঘোষ চক্রবর্তী
ভেন্টিলেশন শব্দটা কানে আসা মাত্রই একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায় ময়ূরাক্ষীর। মায়ের দু’দিন ধরে ডায়েরিয়া। বাড়িতেই স্যালাইনের দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। কারণ মা হাসপাতালে যেতে চায় না কোনওভাবেই। স্যালাইন আর অ্যান্টিবায়োটিকে দু’দিনেই ডায়েরিয়া নিয়ন্ত্রণে কিন্তু তিনদিনের দিন হঠাৎ মার বুকে একটা অস্বস্তি। শ্বাসকষ্ট শুরু হল। আর দেরি করেনি সে। সোজা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে। বাইপাপ চালু হল। পালস ফ্ল্যাকচুয়েট করছে। টেস্ট হল অনেকগুলো। অ্যারিথমিয়া— বললেন ডক্টর। হার্টের সমস্যা ছিল ছোটখাটো কিন্তু তেমন গুরুত্ব দেয়নি কখনও। অনেক চেষ্টা করেও বাইপাপ নিতে পারল না মা। রাতেই চিকিৎসকের একটি টিম সিদ্ধান্ত নিল ভেন্টিলেশনে দেবার। কনসেন্ট লাগবে ময়ূরাক্ষীর। মায়ের শরীর নিজে থেকে কোনও সাপোর্ট টানতে পারছে না। কন্ডিশন স্টেবল করতে দ্রুত ভেন্টিলেশন চালু করতে হল। জ্ঞান নেই, কন্ডিশন ক্রিটিকাল।

ভেন্টিলেশন শব্দটা শুনলেই বুকের ভিতরটা কেমন কেঁপে ওঠে। মাথায় তখন কতশত প্রশ্ন চলে আসে যাঁর এই অভিজ্ঞতা হয়নি তাঁকে বলে বোঝানো সম্ভব নয়। আমাদের দেশে অধিকাংশ মানুষের ধারণা ভেন্টিলেটর আসলে টাকা রোজগারের মেশিন। ভেন্টিলেশনে রাখলে অযথা প্রচুর পরিমাণ অর্থব্যয় হয় এবং তার পরেও সেই রোগীর বাঁচার কোনও আশা থাকে না। ভেন্টিলেশনের পেশেন্ট মানে গুরুতর অবস্থা বা শেষ অবস্থা। হাসপাতাল, নার্সিংহোমের ব্যবসায়িক স্ট্রাটেজি। সত্যি কি তাই? ভেন্টিলেশন থেকে কি আদৌ কেউ সুস্থ হয়ে ফিরতে পারে না? শেষবেলাতেই এর প্রয়োজন? এই ধারণা অনেকটাই ভুল। কোভিড-১৯ অতিমারির কালে কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র বা ভেন্টিলেটরের প্রয়োজনীয়তার কথা সাধারণ মানুষ টের পেয়েছেন। করোনা ভাইরাস শ্বাসনালি হয়ে ফুসফুসকে আক্রমণ করে। বেশিরভাগ মানুষেরই অল্পস্বল্প শ্বাসকষ্ট হয়, কিন্তু ৫ শতাংশ রোগীর মারাত্মক রকমের শ্বাসকষ্ট হয়। তাঁদের জীবন বাঁচাতে ভেন্টিলেশনের রাখা দরকার হয়।

আরও পড়ুন: "স্ত্রীর কামড় থেকে বাঁচতে" চিকিৎসকের আজব প্রেসক্রিপশন! থানায় SSKM কর্তৃপক্ষ

ভেন্টিলেশন কী
মেডিক্যাল ভেন্টিলেটর হল একটি যন্ত্র বা যান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা, সহজ কথায় কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র। কোনও নির্দিষ্ট কারণে রোগীর ফুসফুস যখন স্বাভাবিক ছন্দে কাজ করতে পারে না বা রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাস নেবার ক্ষমতা স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যায়, এই অবস্থা একটানা চলতে থাকলে শরীরে অক্সিজেন কমে যায় ও কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যায়। ফলে রোগীর অবস্থা আরও জটিল হয়ে ওঠে। তখন তাকে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দিতে হয়। ভেন্টিলেটর সাপোর্ট রেডি রাখা হয় ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিট বা (ICU), ক্রিটিকাল কেয়ার ইউনিট, ইনটেনসিভ কার্ডিয়াক কেয়ার ইউনিট-এর পেশেন্টদের জন্যে। মেডিক্যাল ভেন্টিলেটর বা রেসপিরেটর সাপোর্ট রোগীকে শ্বাস নিতে সাহায্য করে। একটি ভেন্টিলেটর নির্দিষ্ট সেটিংসে শরীরের প্রয়োজন অনুসারে  ফুসফুসের ভেতরে এবং বাইরে বাতাসকে আলতো করে (অক্সিজেন-সহ বা ছাড়াই) ঠেলে দেয়। ভেন্টিলেটরে মুখে ফিটেড মাস্কও পরানো হয় আবার গলা থেকে একটা উইন্ডপাইপ প্রবেশ করিয়ে সরাসরি ফুসফুসকে সচল রাখা হয়।

ভেন্টিলেটর আবিষ্কার
একটা সময় মারাত্মক ছিল পোলিও রোগ যা আজকের কোভিড ১৯ অতিমারির চেয়েও ভয়াবহ। ১৯২৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত পোলিও আক্রান্তের মৃত্যুর হার ছিল অনেক বেশি। ১৯২৮ সালে বস্টনের স্কুল অফ পাবলিক হেলথের চিকিৎসক ফিলিপ ড্রিঙ্কার ও ল্যুইস অ্যাগাসিস নামে দু’জন চিকিৎসক আয়রন লাংস নামে প্রথম মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটর আবিষ্কার করেন। এর অনেক বছর পরে ১৯৫২ সালে কোপেনহেগেনে পোলিওর মহামারী শুরু হয়। সেখানকার হাসপাতালগুলোয়  প্রায় ৮৭% পোলিও রোগীর শ্বাসনালির পেশি অকেজো হয়ে মৃত্যু হচ্ছিল। ওই বছর অগাস্ট মাসে ইয়ন ইবসেন নামে এক অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ আধুনিক ভেন্টিলেটর তৈরি করেন। সেই ভেন্টিলেটর ব্যবহারের মাধ্যমেই এক বছরের মধ্যেই পোলিওতে মৃত্যুহার নেমে আসে প্রায় ১১%। এরপর প্রযুক্তি আরও উন্নত হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে আসে এখনকার অত্যাধুনিক ভেন্টিলেটর। এর সাহায্যে অজস্র মুমূর্ষু মানুষকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে।

কোন ক্ষেত্রে ভেন্টিলেশন জরুরি
ভেন্টিলেটর সাপোর্টের প্রয়োজন হয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ জটিল মেডিক্যাল এমার্জেন্সির ক্ষেত্রে। যেমন—
শ্বাসপ্রশ্বাস জনিত জটিলতা : হাঁপানি, নিউমোনিয়া, সিওপিডি, কোভিডের জটিল অবস্থা বা ফুসফুসের জটিলতা ইত্যাদি।
অক্সিজেন লেভেল কমে গেলে : রক্তে অক্সিজেন কমে গেলে (হাইপক্সিয়া) শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সেই সময় জরুরি ভিত্তিতে ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করা হয়।
অপারেশনের-পরবর্তী সময় : কোনও বড় বা জটিল অস্ত্রোপচারে যখন রোগী নিজে শ্বাস নিতে পারেন না তখন অনেক সময় সাময়িকভাবে ভেন্টিলেশনের দরকার পড়ে।
সেরিব্রাল স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক : মস্তিষ্ক আমাদের শ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে। মস্তিষ্কে সমস্যা হলে রোগী স্বাভাবিক শ্বাস নিতে পারে না। যেমন সিভিয়ার হার্ট অ্যাটাক, সেরিব্রাল ইত্যাদির ক্ষেত্রে ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন পড়ে।
সংক্রমণ বা সেপসিস : কোনও শারীরিক গুরুতর জটিলতার কারণে যদি সারা শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে বা সেপসিস হয়ে যায় তখন রোগীকে স্থিতিশীল রাখতে ভেন্টিলেশনের সাহায্যের প্রয়োজন পড়ে। বিষাক্ত সাপে কামড়ালে ভেন্টিলেশন জরুরি হয়ে পড়ে।
গুলেনবারে সিন্ড্রোম : গুলেনবারে সিন্ড্রোমের মতো কিছু অসুখে যখন শরীরের মাংসপেশি অত্যধিক দুর্বল হয়ে যাওয়ার জন্যে নিঃশ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা চলে যায় সেই সময়েও কৃত্রিমভাবে শ্বাস চালু রাখার জন্যে ভেন্টিলেটরের সাহায্য নিতে হয়।
রোগী ভেন্টিলেটর থেকে সুস্থ হয়ে বেরিয়ে আসতে পারবেন কিনা তা নির্ভর করে তাঁর সার্বিক শারীরিক অবস্থার উপর। অনেক ক্ষেত্রেই রোগী ভাল হয়ে ওঠেন। আবার কিছু ক্ষেত্রে হয় না। ভেন্টিলেটরে রোগীকে যখন রাখা হয় তখন জীবনদায়ী ওষুধ চলে এবং একাধিক বার নানা টেস্ট করানোর প্রয়োজন হয়। ফলে খরচ বাড়ে। তবে একবার রোগীকে ভেন্টিলেশনে দিলে যে কোনও সময় বের করে আনা যায় না। আইন অনুযায়ী রোগী সুস্থ হলে বা মারা গেলে তবেই ভেন্টিলেশন মেশিন খোলা যায়। মানুষ মারা যাওয়ার পরেও জোর করে  তাকে ভেন্টিলেটরে রেখে বিল বাড়ানোর যে ধারণা প্রচলতি সেটা ভুল। কারণ বুঝতে হবে ভেন্টিলেটর শুধুমাত্র শ্বাস-প্রশ্বাস চালু রাখতে পারে। মানুষ মারা গেলে তাকে বাঁচিয়ে রাখতে কিন্তু পারে না।