অভাবের সংসারে দামি রং-তুলি কেনার সামর্থ্য ছিল না কোনও দিনই। কিন্তু সেই আর্থিক প্রতিকূলতা দমিয়ে রাখতে পারেনি শান্তিপুরের তরুণ বিকাশ দে-র শিল্পভাবনাকে। তুলির বিকল্প হিসেবে হাতের কাছে থাকা মাত্র পাঁচ-দশ টাকার সাধারণ রঙিন বলপেনকেই বেছে নিয়েছিলেন তিনি। সেই সাধারণ বলপেনের নিপুণ টানেই সৃষ্টি হয়েছে একের পর এক অসাধারণ চিত্রকর্ম। আর সেই সৃষ্টির হাত ধরেই এ বার আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বীকৃতি পেলেন নদিয়ার এই তরুণ শিল্পী। থাইল্যান্ডে আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে প্রদর্শনের জন্য নির্বাচিত হয়েছে বিকাশের আঁকা বিশেষ পেন-ড্রয়িং 'ওয়ান্ডারিং ইন ইওরসেলফ'।

পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, শৈশব থেকেই ছবি আঁকার প্রতি গভীর টান ছিল বিকাশের। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই ঘরের মেঝে কিংবা খাতার পাতায় পেন-পেন্সিল নিয়ে আঁকাআঁকি শুরু। ব্যয়বহুল আর্ট পেপার বা চড়া দামের রঙের পরিবর্তে সাধারণ রঙিন বলপেনের সূক্ষ্ম রেখা ও রঙের নিখুঁত শেড তৈরি করেই ধীরে ধীরে নিজের এক নিজস্ব শৈলী গড়ে তোলেন তিনি। মানুষের জীবনদর্শন, অন্তর্নিহিত অনুভূতি এবং সমাজের বাস্তব ছবিই তাঁর সৃষ্টির প্রধান বিষয়বস্তু। নির্বাচিত 'ওয়ান্ডারিং ইন ইওরসেলফ' ছবিতেও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মানুষের অন্তর্জগতের নানা গভীর ভাবনা।

বিকাশের এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে এক দীর্ঘ লড়াইয়ের গল্প। তাঁর মা অপর্ণা দে এক সময় দিনমজুরি হিসেবে বিড়ি বাঁধতেন, বর্তমানে তিনি সেলাইয়ের কাজ করেন। বাবা আগে একটি ছোট চায়ের দোকান চালাতেন, কিন্তু দোকান উচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার পর এখন ফুটপাতে বসেই চা বিক্রি করেন। সংসারে টানাপড়েন থাকলেও পড়াশোনা থামাননি বিকাশ। সংস্কৃতে স্নাতক হওয়ার পর আইটিআই থেকে ফিটার ট্রেডের প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। তবে পেশাগত শিক্ষার পাশাপাশি ছবি আঁকাকেই নিজের ধ্যানজ্ঞান করে রেখেছিলেন তিনি। সম্প্রতি 'সুরভারতী সঙ্গীত কলাকেন্দ্র'-এর মাধ্যমে তাঁর এই পেন-ড্রয়িংটি থাইল্যান্ডের আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে নির্বাচিত হওয়ার খবর পৌঁছতেই খুশির হাওয়া গোটা শান্তিপুরে। এক সাধারণ তরুণের এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে গর্বিত পরিবার থেকে শুরু করে স্থানীয় বাসিন্দারাও।