হাওড়-বাওড়ের জেলা কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া গ্রাম। বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটা দেখতে বছরভর দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকেরা ভিড় জমান এই নিভৃত পল্লিতে। অথচ সেই ঐতিহাসিক ভিটার পাশেই পর্যটন দফতরের তৈরি দোতলা অতিথিশালাটি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে পড়ে রয়েছে কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায়। গত চোদ্দো বছরে সেখানে এক জন পর্যটকও রাত কাটাতে পারেননি। ফলে সরকারি তহবিলের বিপুল অর্থ খরচ করে তৈরি পরিকাঠামো সাধারণের কোনও কাজেই আসছে না।
প্রযুক্তিবিদ, শিশুসাহিত্যিক তথা সঙ্গীতস্রষ্টা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর এই জন্মভিটা বর্তমানে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের অধীনে থাকলেও সামগ্রিক চেহারা বেশ জরাজীর্ণ। কটিয়াদী এলাকায় উন্নতমানের আবাসিক হোটেলের অভাব দীর্ঘদিনের। ফলে পর্যটকদের রাত্রিবাসের ভোগান্তির কথা ভেবে ২০১১ সালে ভিটার পাশেই একটি আধুনিক অতিথিশালা নির্মাণের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন। দোতলা ভবন, সীমানাপ্রাচীর ও সংযোগকারী রাস্তা নির্মাণে খরচ হয় প্রায় ৭০ লক্ষ টাকা। যার মধ্যে ভবন নির্মাণ ও আসবাবপত্র কিনতেই ব্যয় হয়েছিল ৫২ লক্ষ টাকা। ২০১২ সালের মাঝামাঝি ঘটা করে উদ্বোধন হলেও সেই যে তালা ঝুলল, আর খোলেনি।
কিন্তু কেন এই অচলাবস্থা? স্থানীয় সূত্রে খবর, ভবন তৈরি হলেও গত দেড় দশকে সেখানে এক জন কর্মীও নিয়োগ করা হয়নি। ম্যানেজার, কেয়ারটেকার, রাঁধুনি কিংবা সাফাইকর্মী— কোনও পদই তৈরি করেনি পর্যটন দফতর। কর্মী নিয়োগের আর্জি জানিয়ে উপজেলা প্রশাসনের তরফে দফায় দফায় চিঠি পাঠানো হলেও কোনও সুরাহা মেলেনি। দীর্ঘ অবহেলায় এক সময় জানালার গ্রিল, বিদ্যুতের তার পর্যন্ত চুরি হয়ে গিয়েছিল। নষ্ট হয়ে গিয়েছিল দামি আসবাবপত্র, অকেজো হয়ে পড়েছিল শৌচাগার ও জল সরবরাহ ব্যবস্থা। আলোহীন চত্বরে বসত সমাজবিরোধীদের ঠেক। বর্তমানে স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি অফিসের এক ঝাড়ুদারের জিম্মায় রয়েছে গোটা চত্বর।
সম্প্রতি সরকারি এক শীর্ষ কর্তার সফরকে কেন্দ্র করে তড়িঘড়ি ভবনটি সংস্কার ও রং করা হয়েছে। ভেতরে নতুন খাট, সোফা, ডাইনিং টেবিল, আইপিএস এবং ইন্টারনেট সংযোগ বসানো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান এখনও অধরা।
ভিটা দেখতে আসা পর্যটকদের স্পষ্ট ক্ষোভ, হাতের কাছে এক গ্লাস জল দেওয়ার লোক নেই, সেখানে পরিবার নিয়ে রাত্রিবাস করবে কে? পরিকাঠামো তৈরি করলেই হয় না, পরিষেবা দেওয়ার ব্যবস্থাও করতে হয়। স্থানীয় পঞ্চায়েত নেতৃত্বের মতে, কর্মী ছাড়া একটি পূর্ণাঙ্গ অতিথিশালা চালানো অবাস্তব। বিষয়টি দ্রুত উপজেলা সমন্বয় বৈঠকে তোলার আশ্বাস দিয়েছেন তাঁরা।
প্রশাসনের একাংশের দাবি, মেরামতের পর অতিথিশালাটি এখন ব্যবহারযোগ্য, সম্প্রতি কয়েক জন সাংবাদিক সেখানে রাতও কাটিয়েছেন। তবে পর্যটকদের আক্ষেপ, স্থায়ী কর্মী ও পেশাদার পরিষেবা ব্যবস্থা গড়ে না উঠলে কোটি টাকার এই সরকারি সম্পত্তি কেবল প্রদর্শনী হয়েই দাঁড়িয়ে থাকবে, পর্যটকদের কোনো কাজে আসবে না।















