বিবাহবিচ্ছেদের (Divorce) পর প্রাক্তন স্ত্রীর খোরপোষ (Maintenance) বা ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার কতদিন থাকে? এই নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনি ধোঁয়াশার অন্ত নেই। সম্প্রতি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানিতে এই বিষয়ে এক ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত স্পষ্ট রায় দিল কলকাতা হাইকোর্ট (Calcutta High Court)। আদালতের স্পষ্ট বার্তা— বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে গেলেও প্রাক্তন স্ত্রীর খোরপোষ পাওয়ার আইনি অধিকার কিন্তু শেষ হয়ে যায় না। 

আরও পড়ুন: অখিলেশের সঙ্গে ‘গোপন বৈঠক’ CJP-র! যোগীর গদি ওল্টাতে জেন জি-মিলেনিয়ালদের পাশে চায় SP

কতদিন খোরপোষ পাবেন প্রাক্তন স্ত্রী?

কলকাতা হাইকোর্টের একক বেঞ্চের বিচারপতি উদয় কুমার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বিবাহবিচ্ছেদের ডিক্রি জারি হওয়া মানেই স্ত্রীর ভরণপোষণ পাওয়ার আইনি অধিকার মুছে যাওয়া নয়। আইন অনুযায়ী, যতদিন না পর্যন্ত ওই মহিলা দ্বিতীয়বার বিয়ে করছেন (Remarriage) এবং যতদিন তিনি নিজের ভরণপোষণে অক্ষম থাকছেন, ততদিন প্রাক্তন স্বামীকে খোরপোষ দিয়ে যেতে হবে। আইনপ্রণেতাদের মূল উদ্দেশ্যই হল যাতে কোনও ডিভোর্সি মহিলা আর্থিক সংকটে না পড়েন। আইনের চোখে পুনর্বিবাহ না করা পর্যন্ত একজন ডিভোর্সি মহিলাও ‘স্ত্রী’ হিসেবেই গণ্য হন।

মামলার প্রেক্ষাপট ও আদালতের পর্যবেক্ষণ

আদালতে মামলাটি দায়ের করেছিলেন সমর পাল নামের এক ব্যক্তি। ২০১৯ সালে তাঁর স্ত্রী ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ১২৫ নম্বর ধারায় ভরণপোষণের মামলা করেন। আদালত তখন স্ত্রীর জন্য মাসিক ১৫০০ টাকা এবং তাঁদের মেয়ের জন্য ২০০০ টাকা খোরপোষ মঞ্জুর করে। এরপর ২০২২ সালে স্বামী একতরফাভাবে (Ex-parte) বিবাহবিচ্ছেদের ডিক্রি পেয়ে যান। 

ডিভোর্স পাওয়ার পর স্বামী আদালতে দাবি করেন যে, যেহেতু তাঁদের বৈবাহিক সম্পর্ক এখন আর নেই, তাই তাঁর খোরপোষ দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও শেষ হয়ে গিয়েছে। স্বামীর এই দাবি সম্পূর্ণ খারিজ করে দিয়েছে হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট বলে, স্বামীর আবেদনের ভিত্তিতে ডিভোর্স হলেও প্রাক্তন স্ত্রীর প্রতি তাঁর আইনি দায়বদ্ধতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে যায় না। 

আরও পড়ুন: ক্ষমতায় এসেই উল্টো সুর! টেটের কোপে ৯০ হাজার কর্মরত শিক্ষক, প্রশ্নের মুখে বিজেপির প্রতিশ্রুতি

প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের খোরপোষ নিয়ে বড়ো রায়

এই মামলায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। ভরণপোষণের আবেদন করার প্রায় দুই বছর আগেই দম্পতির মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক (Major) হয়েছিলেন। যেহেতু মেয়েটির কোনও শারীরিক বা মানসিক অক্ষমতা ছিল না, তাই হাইকোর্ট স্পষ্ট জানায় যে, ফৌজদারি আইনের ১২৫ ধারা অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান বাবার থেকে খোরপোষ দাবি করতে পারে না। তবে চাইলে হিন্দু দত্তক ও ভরণপোষণ আইন, ১৯৫৬ (HAMA)-এর অধীনে মেয়েটি স্বাধীনভাবে সিভিল কোর্টে তাঁর অধিকার দাবি করতে পারেন। ফলে মেয়ের খোরপোষের নির্দেশটি বাতিল করে দেয় আদালত। 

আরও পড়ুন: এর নাম পরিবর্তন! ‘বামপন্থী’ হয়েও BJP-কে ভোট দিয়ে 'আফসোস' সুরেন্দ্রনাথ আইন কলেজের পদত্যাগী উপাধ্যক্ষের

আদালতের কড়া বার্তা

স্বামী দাবি করেছিলেন যে লকডাউনের পর তাঁর ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে এবং তাঁর উপার্জন নেই, অন্যদিকে স্ত্রীর দাবি ছিল স্বামী বহাল তবিয়তে ব্যবসা চালাচ্ছেন। এই টানাপোড়েনের মাঝে নিম্ন আদালত স্বামীর বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি করেছিল। এই প্রসঙ্গে কলকাতা হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ দেয় যে, খোরপোষ আদায়ের আইনি প্রক্রিয়াকে কোনওভাবেই “অন্ধ বা শাস্তিমূলক হাতিয়ার” হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। দুপক্ষের আর্থিক পরিস্থিতি সঠিক তদন্ত সাপেক্ষ। আপাতত বকেয়া টাকার ৫০ শতাংশ জমা দেওয়ার শর্তে স্বামীর বিরুদ্ধে জারি হওয়া ওয়ারেন্ট স্থগিত করেছে হাইকোর্ট এবং নিম্ন আদালতকে দ্রুত মূল মামলাটি নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দিয়েছে। 

হাইকোর্টের এই রায়ের পর এটা পরিষ্কার যে, বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হলেও ভারতের আইন নারীদের আর্থিক সুরক্ষাকেই অগ্রাধিকার দেয়, যা পুনর্বিবাহের আগে পর্যন্ত বহাল থাকে।