ছিলেন বামপন্থী, কিন্তু তৃণমূল আমলের পরিস্থিতি দেখে পরিবর্তনের আশায় বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সরকার বদলাতেই তাঁর উপর নেমে এলো খাঁড়া। সুরেন্দ্রনাথ আইন কলেজের (Surendranath Law College) উপাধ্যক্ষের (Vice Principal) পদ থেকে ইস্তফা দিতে 'বাধ্য' করা হল তাঁকে। ইস্তফা দিয়েই বিস্ফোরক মহম্মদি তারান্নুম (Muhammadi Tarannum) বললেন, এর নাম পরিবর্তন! শুক্রবার ইস্তফা দিয়েই উপাধ্যক্ষ দাবি করেন, তাঁকে জোর করে ইস্তফাপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়েছে। আর সেই অভিযোগ নিয়েই মুখ্যমন্ত্রী ও উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর কাছে বিচারের দাবি জানান তারান্নুম।
আরও পড়ুন: থেমে যায় সময়, মেঘ-পাহাড়ের আলতো ছোঁয়ায় মায়াবী ‘দিলারাম’
কলেজে উপস্থিতির হার নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কই শেষ পর্যন্ত গড়াল উপাধ্যক্ষের পদত্যাগে। অভিযোগ, নির্দিষ্ট হাজিরা না থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষায় বসার অনুমতি দেওয়ার দাবিতে পড়ুয়াদের একাংশ তাঁর উপর চাপ তৈরি করতে শুরু করেন। ঘটনাকে কেন্দ্র করে বুধবার থেকেই উত্তেজনা তৈরি হয়। প্রথমে আলোচনা করে বিষয়টি মেটানোর আশ্বাস দেওয়া হলেও বৃহস্পতিবার ফের শুরু হয় বিক্ষোভ। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে প্রায় ২৪ ঘণ্টা নিজের ঘরেই আটকে থাকতে হয় মহম্মদি তারান্নুমকে। শুক্রবার পুলিশের উপস্থিতিতে অবশেষে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। বাইরে এসে তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ঘরের আলো বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। পানীয় জল দেওয়া হয়নি, এমনকি শৌচাগার ব্যবহারের অনুমতিও মেলেনি। তাঁর দাবি, এই পরিস্থিতির মধ্যেই তাঁকে পদত্যাগপত্রে সই করতে বাধ্য করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: IND vs AFG: চোট নিয়ে সমস্যা অব্যাহত, ফের কোচিং স্টাফ ছাঁটাই বিসিসিআইয়ের
এই ঘটনার নেপথ্যে কলেজের নতুন পরিচালন সমিতি নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ককেও সামনে এসেছে। ব্যারাকপুরের বিধায়ক কৌস্তভ বাগচী নতুন পরিচালন সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরেই উপস্থিতির নিয়ম নিয়ে সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয় বলে অভিযোগ। বলা হয়েছিল, অন্তত ৪০ শতাংশ উপস্থিতি থাকা পড়ুয়ারা পরীক্ষায় বসতে পারবেন। এরপরই যাঁদের উপস্থিতি সেই সীমার নিচে, তাঁদের একাংশ বিক্ষোভে সামিল হন।
তারান্নুমের দাবি, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা মেটানোর চেষ্টা করা হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বুধবার সন্ধ্যায় সাময়িক ভাবে ঘেরাও উঠলেও পরের দিন ফের তাঁকে ঘিরে বিক্ষোভ শুরু হয়। অভিযোগ, তাঁর সঙ্গে থাকা ছ’জন শিক্ষককেও ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর দু’দিকের দরজা বন্ধ করে তাঁকে কার্যত একা আটকে রাখা হয়। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
কলেজ থেকে বেরিয়ে রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন তারান্নুম। তাঁর বক্তব্য, অতীতে তিনি বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ঠিকই, তবে ২০১৬ সালের পর থেকে কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্যপদে নেই। তাঁর অভিযোগ, সেই পুরনো রাজনৈতিক পরিচয়কে সামনে রেখে তাঁকে একাধিকবার কটাক্ষের মুখে পড়তে হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি অবশ্য তাঁর পদত্যাগ ঘিরে। তারান্নুমের দাবি, তিনি স্বেচ্ছায় পদ ছাড়েননি। তাঁর কথায়, দীর্ঘ সময় ঘেরাও করে রাখার পরই তাঁকে ইস্তফাপত্রে সই করানো হয়েছে। সেই পদত্যাগপত্র কলেজ পরিচালন সমিতির সভাপতি, ডিপিআই, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছে।
কলেজ ছাড়ার সময়ও নিজের অবস্থান বারবার স্পষ্ট করে দেন তিনি। বলেন, “আমি পদত্যাগ করিনি।” একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী ও উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর কাছে গোটা ঘটনার তদন্তের আবেদন জানিয়েছেন তিনি। তারান্নুমের প্রশ্ন, কলেজে পড়ুয়াদের উপস্থিতি সংরক্ষণের প্রক্রিয়া আদৌ কতটা স্বচ্ছ, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য, শিক্ষকদের উপর এ ভাবে দিনের পর দিন চাপ বা আক্রমণের ঘটনা ঘটতে থাকলে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই শুধু তাঁর পদত্যাগ নয়, উপস্থিতির নিয়ম এবং তাঁকে ঘেরাও করে রাখার গোটা ঘটনাতেই তদন্তের দাবি তুলেছেন তিনি।
















