ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার আবেদন ঘিরে বিতর্কের মধ্যেই নিয়ম বদল করল নির্বাচন কমিশন। এবার থেকে ফর্ম-৭ জমা দিয়ে কোনও ভোটারের নামের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা মেনে চলতে হবে। কমিশনের নতুন নির্দেশ অনুযায়ী, এসআইআর (SIR) চলাকালীন একজন ব্যক্তি সর্বাধিক ১০টি আবেদন করতে পারবেন। ভোটার তালিকার স্বাভাবিক হালনাগাদের সময় সেই সংখ্যা কমে হবে মাসে পাঁচটি। অনলাইন এবং অফলাইন, দুই পদ্ধতিতেই এই বিধি কার্যকর হবে। কমিশনের দাবি, যথেচ্ছভাবে আপত্তি জমা পড়ায় যাচাইয়ের কাজে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছিল। সেই পরিস্থিতি সামাল দিতেই আবেদন জমার সংখ্যা নির্দিষ্ট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: দলনেত্রী গ্রেফতার হতেই পথে প্রতিবাদ তৃণমূল বিধায়ক কুণালের
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর চলাকালীন ফর্ম-৭ (Form-7) জমা দেওয়ার সময় নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। দলের অভিযোগ, বিপুল সংখ্যায় আপত্তি জানিয়ে বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তাদের দাবি ছিল, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শাসক দলের সমর্থকদের ভোটাধিকার সংকুচিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কর্নাটকেও একই বিষয় নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন উপমুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমার। তাঁর দাবি, ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার জন্য বিজেপি কর্মীদের হাতে আগে থেকে ছাপানো ফর্ম-৭ দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে কংগ্রেসের তরফে পুলিশের কাছে অভিযোগও জানানো হয়। যদিও এই অভিযোগগুলির সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য তদন্তের ফলাফল ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ জরুরি।
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, নির্দিষ্ট সীমা না থাকায় কিছু ক্ষেত্রে অযৌক্তিক কারণে বিপুল সংখ্যায় আপত্তি জমা পড়েছে। এর ফলে ভোটার তালিকা যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা আধিকারিকদের কাজ বেড়েছে এবং নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া জটিল হয়েছে। নতুন নিয়মে এই প্রবণতা ঠেকানোর পাশাপাশি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আপত্তি জানানো হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারদের মাধ্যমে বুথ স্তরের আধিকারিকদের এই নির্দেশ কার্যকর করতে হবে। ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধিমালার ১৩(২) ধারা অনুযায়ী, ভোটার তালিকায় কোনও ব্যক্তির নামের বিরুদ্ধে আপত্তি জানাতে ফর্ম-৭ ব্যবহার করা হয়। সংশ্লিষ্ট বিধানসভা কেন্দ্রে নিবন্ধিত ভোটারই এই আবেদন করতে পারেন।
এদিকে, তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটারদের ফের নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ফর্ম-৬ ব্যবহারের সিদ্ধান্তও প্রশ্নের মুখে। কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাদ পড়া ব্যক্তিদের আবেদন পূরণে বুথ লেভেল অফিসারেরা তাঁদের বাড়িতে গিয়ে সাহায্য করতে পারবেন। কিন্তু প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেশির বক্তব্য, আগে ভোটার হিসেবে নথিভুক্ত থাকা সত্ত্বেও যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে, তাঁদের নতুন ভোটার হিসেবে বিবেচনা করা হলে তা নিয়ে পদ্ধতিগত প্রশ্ন উঠতে পারে। কারণ, ফর্ম-৬ সাধারণত ভোটার তালিকায় নতুন নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নির্ধারিত। ফলে বাদ পড়া ভোটারদের পুনরায় অন্তর্ভুক্তি এবং অন্য ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন দুই ক্ষেত্রেই কমিশনের পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক জারি রয়েছে।
আরও পড়ুন: ধর্ষক-জঙ্গিদের ধরতে কি এতটাই সক্রিয়? ছেলের আটকের খবরে সরকার-পুলিশকে নিশানা অভিজিতের মায়ের
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধীদের আন্দোলনের আবহে ফর্ম-৭ নিয়ে নতুন নির্দেশ রাজনৈতিক মহলে বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, এসআইআর চলাকালীন ভোটার তালিকা সংশোধনের পদ্ধতি নিয়ে যে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল, কমিশনের বর্তমান পদক্ষেপ সেই বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। যদিও কমিশন জানিয়েছে, নতুন বিধির লক্ষ্য অপ্রয়োজনীয় আপত্তি কমিয়ে সংশোধনের কাজ সহজ করা। তবে এই নিয়ম বাস্তবে কতটা স্বচ্ছতা আনতে পারে, তা নির্ভর করবে আবেদন যাচাইয়ের পদ্ধতি এবং বৈধ ভোটারদের অধিকার সুরক্ষিত রাখার উপর। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটার তালিকার নির্ভুলতা যেমন জরুরি, তেমনই কোনও যোগ্য নাগরিকের নাম যেন অন্যায়ভাবে বাদ না পড়ে, তা নিশ্চিত করাও নির্বাচন কমিশনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।














