শেখ হাসিনাকে (Sheikh Hasina) বাংলাদেশে ফেরানো নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট জানাল দিল্লি। ঢাকার (Dhaka) একের পর এক প্রত্যর্পণ-দাবির পরও কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে নারাজ ভারত। বাংলাদেশের (Bangladesh) পাঠানো প্রত্যর্পণের আবেদন এখনও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে বলেই জানালেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী (Indian High Commissioner Dinesh Trivedi)। তাঁর বক্তব্য, আদালত ও নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া জড়িত থাকায় হাসিনাকে কবে ফেরানো হবে, তার কোনও সময়সীমা বলা সম্ভব নয়। ঢাকায় ‘Bay of Bengal Conversation 2026’-এর আলোচনায় এই মন্তব্য করেন দীনেশ ত্রিবেদী। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের অগাস্টে হাসিনাকে ভারত প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যাও দেন তিনি। তাঁর দাবি, উনি তখনও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে সেই পরিস্থিতিতে তাঁকে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া ছাড়া ভারতের সামনে খুব বেশি বিকল্প ছিল না। সেনার বিমানে চেপে হাসিনা দিল্লি পৌঁছান। ভারতীয় বায়ুসেনা বা সেনা তাঁকে ঢাকা থেকে নিয়ে যায়নি। সেই সময় বাংলাদেশের সরকারি বাসভবনের দিকে আন্দোলনকারীরা এগিয়ে যাচ্ছিলেন।
হাসিনার প্রত্যর্পণ এখন আর শুধুমাত্র একটি আইনি বিষয় নয়—এটি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর কূটনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালে হাসিনা সরকারের পতনের পর মোহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। সেই সময় থেকেই দিল্লি-ঢাকার সম্পর্কে একাধিক বিষয়ে দূরত্ব তৈরি হয়। হাসিনার প্রত্যর্পণের পাশাপাশি সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, সীমান্ত, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং বাংলাদেশের বিদেশনীতি নিয়েও দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য সামনে এসেছে। এরপর ২০২৬ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসে। হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি নতুন সরকারের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে থাকে। বাংলাদেশের তরফে বারবার দ্রুত পদক্ষেপের দাবি উঠেছে। এখানেই তৈরি হচ্ছে মূল কূটনৈতিক টানাপোড়েন। ঢাকার কাছে বিষয়টি রাজনৈতিক ও বিচারিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত; দিল্লি জোর দিচ্ছে প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়ার উপর। ফলে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে সময়ের প্রশ্নটিই এখন বড় হয়ে উঠছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকও এর আগে জানিয়েছিল, বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ-অনুরোধ পাওয়া গিয়েছে এবং সেটি প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া মেনে পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ, নতুন করে কোনও সময়সীমা ঘোষণা না করে দিল্লি আপাতত আইনি প্রক্রিয়াটিকেই সামনে রাখছে।
হাসিনা প্রত্যর্পণ নিঃসন্দেহে পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় চাপের জায়গা। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত—বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, জলবণ্টন, নিরাপত্তা, যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক সংযোগের মতো একাধিক বিষয় দুই দেশের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। তাই হাসিনা ইস্যুতে মতপার্থক্য থাকলেও বৃহত্তর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক চালু রাখার প্রয়োজন দুই দেশেরই রয়েছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের (Prime Minister of Bangladesh Tarique Rahman) দিল্লি সফর নিয়েও কূটনৈতিক স্তরে আলোচনা চলছে। হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্ন এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সামগ্রিক পরিবেশ—দুই বিষয়ই সেই সফরের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারতও জানিয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে তারা বৃহত্তর পারস্পরিক স্বার্থ ও reciprocity-এর ভিত্তিতে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়। হাসিনাকে ঘিরে দিল্লি-ঢাকা টানাপোড়েন কতটা দীর্ঘ হবে, নাকি বৃহত্তর দ্বিপাক্ষিক স্বার্থে দুই দেশ এই ইস্যুর বাইরে সম্পর্কের অন্য ক্ষেত্রগুলিতে এগিয়ে যেতে পারবে— নজরে এখন সেটাই।















