কেন্দ্রের অপরিণামদর্শী এবং জটিল জিএসটি নীতির জাঁতাকলে পড়ে আজ চরম সংকটে দেশের ক্ষুদ্র ও অতি-ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মহল। দেশের কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার এই অসংগঠিত ক্ষেত্রগুলি আজ জিএসটি-র প্রশাসনিক ও পরিকাঠামোগত খরচের বোঝায় আক্ষরিক অর্থেই ধুঁকছে। খোদ কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান মন্ত্রকের আওতাধীন ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে অফিসের বার্ষিক সমীক্ষাতেই এই ভয়াবহ চিত্রটি ফুটে উঠেছে।

রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, মূল কর মেটানোর খরচ নয়, কেবল জিএসটি-র হিসাব মেলাতে গিয়েই ছোটো ব্যবসায়ীদের নাভিশ্বাস উঠছে। কর্মী নিয়োগ, সফ্টওয়্যার, হার্ডওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে তা বার্ষিক বিক্রিবাটার ৩.২৮ থেকে ১৩.৯০ শতাংশ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকছে। মূলত প্রোপ্রাইটরশিপ বা পার্টনারশিপে চলা এই ছোটো ব্যবসাগুলির বার্ষিক লেনদেন যদি ৪.৯ লক্ষ টাকার কমও হয়, তবুও তাদের জিএসটি সংক্রান্ত প্রশাসনিক খরচ বড়ো ব্যবসাগুলির তুলনায় আনুপাতিক হারে অনেক বেশি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের পরোক্ষ কর ব্যবস্থাকে সহজ করার ঢাক পিটিয়ে জিএসটি চালু করা হলেও বাস্তবে তা এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট দাবি করার সুবিধা থাকা সত্ত্বেও এই ব্যবস্থার কাঠামোগত জটিলতায় জর্জরিত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের নিয়মিতভাবে বারবার করের রিটার্ন দাখিল করতে হচ্ছে এবং সিস্টেম-জেনারেটেড স্টেটমেন্টের সঙ্গে ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিটের হিসাব নিখুঁতভাবে মেলাতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি পণ্য পরিবহণ ও বিক্রির জন্য ই-ওয়ে বিল এবং ই-ইনভয়েসিং তৈরির ঝক্কি তো রয়েইছে। এমনকি সমস্ত হিসাবের পুঙ্খানুপুঙ্খ ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতাও এই ছোটো ব্যবসায়ীদের কাছে এক বিশাল আর্থিক ও মানসিক বোঝার আকার ধারণ করেছে।

এই বিপুল প্রশাসনিক হয়রানি এবং পরিকাঠামোগত খরচের কারণেই অসংগঠিত ক্ষেত্রের সিংহভাগ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জিএসটি-র আওতায় আসতে চাইছেন না। খোদ দেশের আর্থিক সমীক্ষাও স্বীকার করে নিয়েছে যে, কর মেটানোর এই জটিল প্রক্রিয়াই ব্যবসায়ীদের ক্রমশ নিরুৎসাহিত করছে। এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে মুক্তির আশায় ছোটো ব্যবসায়ীরা এখন আসন্ন জিএসটি কাউন্সিল বৈঠকের দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে রয়েছেন। কাউন্সিলের তরফে জানানো হয়েছে যে, এবারের বৈঠকে প্রক্রিয়াগত সংস্কার এবং জিএসটি মেটানো সংক্রান্ত জটিলতা সরল করার দিকে জোর দেওয়া হবে। এখন দেখার বিষয়, আদৌ এই চরম অব্যবস্থার কোনও বাস্তবসম্মত সমাধান সূত্র বেরিয়ে আসে, নাকি আরও একবার কেবল ফাঁকা আশ্বাসের উপর দিয়েই ছোটো ব্যবসায়ীদের দিন গুজরান করতে হয়।