“যুদ্ধ, আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং সারের সরবরাহে বাধা এই তিনের সম্মিলিত প্রভাব আগামী দিনে বড় খাদ্যসংকট তৈরি করতে পারে।” বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের (S. Jaishankar) এই সতর্কবার্তার পরই নতুন করে আলোচনায় এসেছে খাদ্যপণ্যের দাম। পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে তার অভিঘাত যে শুধু জ্বালানি বা পরিবহণের খরচে আটকে থাকবে না, বরং কৃষি ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার উপরও চাপ তৈরি করতে পারে, সেই আশঙ্কাই সামনে আসছে। এর ফলে আগামী দিনে সাধারণ মানুষের মাসিক বাজেটে বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে খাবারের বাজার থেকেও।
কৃষির খরচ বাড়ার প্রভাব অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে বাজারে দেখা যায় না। সার, জ্বালানি, পরিবহণ এবং অন্যান্য কৃষি উপকরণের দাম বাড়লে প্রথমে চাষের খরচ বাড়ে। কিন্তু সেই বাড়তি ব্যয় পরবর্তী সময়ে ফসলের দামেও প্রতিফলিত হতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে সারের সরবরাহ ব্যাহত হলে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাব্য কারণ শুধু ফলন কমে যাওয়া নয়, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়াও।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে চাল ও গমের বাজার। ভারতের খাদ্যব্যবস্থায় এই দুই শস্যের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। উৎপাদন বা সরবরাহে বড় ধরনের সমস্যা হলে তার প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। চালের ক্ষেত্রে আবহাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে গমের দাম বাড়লে তার প্রভাব আটা-ময়দার পাশাপাশি রুটি, বিস্কুট, বেকারি সামগ্রী এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবারের উপরও পড়তে পারে।
ডাল ও ভোজ্য তেলের বাজারেও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কোনও বড় উৎপাদক দেশে ফসল নষ্ট হলে কিংবা রপ্তানিতে বিধিনিষেধ তৈরি হলে বিশ্ববাজারে জোগান কমতে পারে। আমদানিনির্ভর বাজারে তার প্রভাব পড়ে দামে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি হওয়া চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতার মাসিক বাজারের খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা। অতিরিক্ত বৃষ্টি, খরা বা অস্বাভাবিক তাপমাত্রা কৃষি উৎপাদন ব্যাহত করলে একদিকে ফসলের জোগান কমতে পারে, অন্যদিকে বাড়তে পারে চাষের খরচ। ধান, গম, ভুট্টার মতো গুরুত্বপূর্ণ ফসল একই সময়ে আবহাওয়ার ধাক্কা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ সমস্যার মুখে পড়লে খাদ্যবাজারে চাপ আরও বাড়তে পারে। জয়শঙ্করের সতর্কবার্তার গুরুত্ব এখানেই সমস্যাটি কোনও একটি পণ্য বা একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে একাধিক কারণের সম্মিলিত ফল হতে পারে।
তবে এখনই সব খাদ্যপণ্যের দাম একসঙ্গে বাড়বে, এমন কোনও নিশ্চিত পূর্বাভাস নেই। সরকারি খাদ্যশস্য মজুত, আমদানি-রপ্তানি নীতি, দেশীয় উৎপাদন এবং বাজারে সরবরাহ—সবকিছুই দামের গতিপথ নির্ধারণ করবে। কিন্তু যুদ্ধ, আবহাওয়া এবং সারের জোগান নিয়ে যে ঝুঁকির কথা বিদেশমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, তা দীর্ঘস্থায়ী হলে নজরে রাখতে হবে চাল, গম, ডাল ও ভোজ্য তেলের বাজারকে। জ্বালানি থেকে শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক অস্থিরতার পরবর্তী বড় অভিঘাত যে খাদ্যের বাজারেও এসে পড়তে পারে, জয়শঙ্করের সতর্কবার্তা সেই সম্ভাবনাই সামনে এনে দিয়েছে।















