ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR-কে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বিরোধীদের সংঘাত আরও তীব্র। এবার মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি তুললেন কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর। তাঁর বক্তব্য, কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধীদের আস্থা নষ্ট হয়েছে। তাই নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে জ্ঞানেশ কুমারের পদ ছেড়ে দেওয়া উচিত। অন্যথায় সংসদে তাঁর অপসারণের লক্ষ্যে ইমপিচমেন্টের প্রস্তাব আনার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন থারুর।
একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে থারুরের অভিযোগ, ২০২৩ সালের একটি আইনের মাধ্যমে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের আইনি রক্ষাকবচ দিয়েছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। তবে এই আইনি সুরক্ষাকে সাংবিধানিক সুরক্ষার সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয় বলেও দাবি করেছেন তিনি। এবার প্রশ্ন হচ্ছে, কী রয়েছে ২০২৩ সালের আইনে? মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ, চাকরির শর্ত ও কার্যকালের মেয়াদ সংক্রান্ত ২০২৩ সালের আইনের ১৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, সরকারি দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত কাজের জন্য দায়িত্বে থাকা বা অবসরপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাচন কমিশনার কিংবা নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা গ্রহণ বা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আদালতের উপর বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে সরকারি দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কহীন কাজের ক্ষেত্রে এই ধারার সুরক্ষা স্পষ্টভাবে প্রযোজ্য নয়।
এই ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে শীর্ষ আদালত কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনের কাছে জবাব চাইলেও সংশ্লিষ্ট ধারার উপর স্থগিতাদেশ দেয়নি। থারুরের অভিযোগ, ২০২৩ সালের শীতকালীন অধিবেশনে বিরোধী সাংসদদের সংসদ থেকে বহিষ্কারের পর এই আইন পাশ করানো হয়েছিল। সংবিধানে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের ব্যবস্থা রয়েছে এবং সেই পথেই এগোতে পারে বিরোধীরা। সংবিধানের ৩২৪(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে যে পদ্ধতি ও কারণে অপসারণ করা যায়, সেই একই পদ্ধতি ও কারণে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণ করতে হয়। অন্য নির্বাচন কমিশনারদের ক্ষেত্রে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সুপারিশ প্রয়োজন। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR নিয়ে একাধিক অভিযোগ তুলেছেন থারুর। তাঁর বক্তব্য, মৃত, অনুপস্থিত কিংবা অন্যত্র চলে যাওয়া ভোটারদের নাম যাচাই করে বাদ দেওয়ার বিরোধিতা তাঁরা করছেন না। আপত্তি রয়েছে সেই প্রক্রিয়ার পদ্ধতি, দ্রুত নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং সংশোধন ও আপিলের দীর্ঘ মেয়াদ নিয়ে।
বিরোধীদের দাবি, SIR প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত রাখতে হবে, ভুলভাবে বাদ পড়া ভোটারদের নাম পুনরায় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত সফটওয়্যার খতিয়ে দেখতে হবে। পাশাপাশি, ভোটার তালিকায় নাম তোলা এবং নাম বাদ দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানানোর জন্য ব্যবহৃত ৬ ও ৭ নম্বর ফর্মে আনা পরিবর্তনও বাতিল করার দাবি তুলেছেন তাঁরা। থারুরের অভিযোগ, কোনও ভোটারের নাম ভুলভাবে বাদ পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী আধিকারিক মনে করলেও সফটওয়্যারের কারণে সেই সিদ্ধান্ত সংশোধন করার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হচ্ছে। গোয়ায় ৯৭টি ঘটনা নয় খোঁজ চালিয়ে একটি প্রতিবেদনের কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। বলেন, নাম বাদ পড়ার পর নাগরিকদেরই প্রমাণ করতে হচ্ছে যে তাঁরা ভোট দেওয়ার যোগ্য। এতে ভোটারের উপরেই প্রমাণের দায় চাপানো হচ্ছে বলে তাঁর অভিযোগ। শুধু তাই নয়, SIR নিয়ে নিজের বক্তব্যের সমর্থনে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের প্রসঙ্গও তুলেছেন থারুর। তাঁর দাবি, ৯৪ বছরের অমর্ত্য সেনের কাছে তাঁর মায়ের সঙ্গে বয়সের ব্যবধান মাত্র ১৫ বছর হওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হয়েছিল। থারুরের বক্তব্য, অতীতে অল্প বয়সে বিয়ে এবং সন্তান জন্ম দেওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক ছিল না। তাই অতীতের পারিবারিক তথ্যকে বর্তমানের মানদণ্ডে বিচার করে ভোটার তালিকা থেকে কারও নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
বিদেশে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, এমন ব্যক্তিদের কাছেও ভোটদানের যোগ্যতা নিয়ে নোটিস পাঠানোর বিষয়টি উল্লেখ করেছেন তিনি।
থারুরের দাবি, বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তাঁর উল্লেখ করা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ পড়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পরেই বিরোধীরা নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলে—এই অভিযোগও খারিজ করেছেন থারুর। তাঁর বক্তব্য, কোনও ভোটার যদি মনে করেন অন্যায়ভাবে তাঁর নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তা হলে সেই অভিযোগ খতিয়ে দেখা জরুরি। আপিল নিষ্পত্তিতে দেরি হলে কোনও নাগরিক একাধিক নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ হারাতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি। যন্তর মন্তরকে নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে তাঁর অভিযোগ, এর ফলে আন্দোলনকারীদের প্রশাসনের কাছাকাছি পৌঁছনো কঠিন হয়ে পড়বে। বিকল্প হিসেবে রামলীলা ময়দান, বুরারি গ্রাউন্ড এবং পূর্ব দিল্লির CBD গ্রাউন্ডের কথা জানানো হয়েছে। থারুরের দাবি, রামলীলা ময়দানে অধিকাংশ সময়ই কর্মসূচি নির্ধারিত থাকায় সেখানে প্রতিবাদ আয়োজনের সুযোগ সীমিত। চলতি বছরের জন্য তিনি ২৯ থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কয়েকটি তারিখ খালি পেয়েছিলেন। ফলে আন্দোলনকারীদের বুরারি কিংবা যমুনার ওপারের মতো দূরে যেতে হতে পারে। তাঁর মতে, প্রতিবাদের জায়গা প্রশাসনের কেন্দ্র থেকে দূরে সরিয়ে দিলে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছনোর সুযোগও কমে যায়।
থারুরের বক্তব্য, এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য শুধুমাত্র কোনও একজন নির্বাচন কমিশনারকে সরানো নয়। বরং ভোটার তালিকা সংশোধন এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা। তিনি এমন একটি নির্বাচন কমিশন চান, যা আরও নিরপেক্ষ, ভারসাম্যপূর্ণ এবং স্বাধীনভাবে কাজ করবে। তাঁর দাবি, নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দলকে সমান সুযোগ দিতে হবে এবং ভোটারদের স্বাধীনভাবে নিজেদের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। থারুর স্পষ্ট করেছেন, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে জনগণ বিজেপিকে বেছে নিলেও বিরোধীরা সেই রায় মেনে নেবে। কিন্তু নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে আস্থা ফেরানো এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মর্যাদা রক্ষা করা জরুরি বলেই তাঁর বক্তব্য।
সব মিলিয়ে, SIR নিয়ে বিতর্ক এখন আর শুধু ভোটার তালিকায় নাম থাকা বা না-থাকার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই, রাজনৈতিক ও আইনি লড়াই আরও জোরদার করতে চাইছে বিরোধী শিবির।















