মৃত্যুর পর কী? চিরন্তন অন্ধকার, নাকি বিজ্ঞানের হাত ধরে কোনও একদিন আবার ফিরে আসার সম্ভাবনা? এই প্রশ্নের উত্তর এখনও মানুষের জানা নেই। কিন্তু পৃথিবীর কোথাও কোথাও এমন কিছু মানুষ রয়েছেন, যাঁরা মৃত্যুর পরেও ভবিষ্যতের বিজ্ঞানের উপর ভরসা রাখতে চাইছেন। অস্ট্রেলিয়ার ( Australia)  নিউ সাউথ ওয়েলসের ছোট্ট শহর হলব্রুকে তেমনই এক অদ্ভুত অপেক্ষার সাক্ষী একটি কেন্দ্র। সেখানে অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে সাতজন মৃত মানুষের দেহ। উদ্দেশ্য , কোনও একদিন বিজ্ঞান যদি তাঁদের ফিরিয়ে আনার মতো প্রযুক্তি তৈরি করতে পারে!

আরও পড়ুন: US Open: হ্যাটট্রিক অধরা সাবালেঙ্কার, মহিলাদের সিঙ্গলসে চ্যাম্পিয়ন রিবাকিনা

এই পদ্ধতির নাম ‘ক্রায়োনিক্স’ ( Cryonics) । হলব্রুকের ‘সাদার্ন ক্রায়োনিক্স’ অস্ট্রেলিয়ায় মানবদেহ সংরক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিশাল ধাতব পাত্রে তরল নাইট্রোজেনের সাহায্যে প্রায় মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় দেহগুলি রাখা হয়। সাধারণ অর্থে এটি কোনও হিমঘর নয়। অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রা বজায় রেখে দেহের কোষ এবং বিশেষ করে মস্তিষ্কের ( Brain) সূক্ষ্ম গঠন যতটা সম্ভব অক্ষত রাখার চেষ্টা করা হয়। কেন্দ্রটির পরিকল্পনার কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালে। কয়েক বছরের প্রস্তুতির পর ২০২৩ সালে সেটি কার্যকর হয়। পরের বছর, ২০২৪ সালের মে মাসে, সেখানে প্রথম ব্যক্তির দেহ সংরক্ষণ করা হয়। সিডনির আশির কোঠার এক ব্যক্তি ১২ মে মারা যাওয়ার পর শুরু হয় দীর্ঘ প্রক্রিয়া। দক্ষিণ গোলার্ধে মানবদেহ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ঘটনাটি ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

তবে দেহকে শুধু বরফের মতো জমিয়ে রাখলেই ক্রায়োনিক্সের কাজ শেষ হয় না। বরং এখানেই রয়েছে সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ। মানুষের শরীরের অধিকাংশ অংশই জল। স্বাভাবিক ভাবে জল জমে বরফে পরিণত হলে তৈরি হতে পারে ক্ষুদ্র বরফকণা, যা কোষের গঠন ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। মস্তিষ্কের ক্ষেত্রে এই ক্ষতির গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ স্মৃতি, ব্যক্তিত্ব এবং চেতনার সঙ্গে সম্পর্কিত অসংখ্য সূক্ষ্ম স্নায়বিক সংযোগ সেখানে রয়েছে। এই কারণেই ক্রায়োনিক্সে ‘ভিট্রিফিকেশন’ বা কাচসদৃশ অবস্থায় সংরক্ষণের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। বিশেষ সংরক্ষণকারী তরল ব্যবহারের মাধ্যমে কোষের ভিতরে বরফের স্ফটিক তৈরি হওয়ার ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা হয়। লক্ষ্য একটাই—ভবিষ্যতে যদি কখনও উন্নত প্রযুক্তি তৈরি হয়, তাহলে সংরক্ষিত মস্তিষ্ক ও শরীরের যতটা সম্ভব বেশি অংশকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ রাখা।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে কেন্দ্রটিতে দ্বিতীয় ব্যক্তির দেহ সংরক্ষণ (Body Preservation) করা হয়। পরে আরও কয়েকজনকে সেখানে রাখা হয়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাদার্ন ক্রায়োনিক্সে সংরক্ষিত মানবদেহের সংখ্যা সাত। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হল—এঁরা কি সত্যিই কোনওদিন ফিরে আসতে পারবেন? এর উত্তর আজকের বিজ্ঞানের কাছে নেই। ক্রায়োনিক্স কোনও প্রমাণিত চিকিৎসা পদ্ধতি নয়। এখনও পর্যন্ত মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সংরক্ষিত কোনও মানুষকে পুনরায় জীবিত করে তোলার নজির নেই। এমনকি সম্পূর্ণ স্তন্যপায়ী প্রাণীর মস্তিষ্ককে এই ধরনের সংরক্ষণ থেকে ফিরিয়ে এনে স্বাভাবিক ভাবে কার্যকর করার প্রযুক্তিও এখনও বাস্তব হয়ে ওঠেনি।

তবু এই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য মানুষ বিপুল অর্থ খরচ করছেন। সম্পূর্ণ দেহ সংরক্ষণে খরচ হতে পারে ২ লক্ষ অস্ট্রেলীয় ডলারেরও বেশি। কেউ কেউ জীবনবিমার মাধ্যমে সেই অর্থের ব্যবস্থা করেন। তাঁদের যুক্তি সহজ—আজকের চিকিৎসাবিজ্ঞান যে রোগের কাছে পরাজিত, ভবিষ্যতের বিজ্ঞান হয়তো একদিন সেই রোগের সমাধান খুঁজে পাবে। অবশ্য এই সম্ভাবনার পরিমাণ নিয়েও মতভেদ রয়েছে। সাদার্ন ক্রায়োনিক্সের চেয়ারম্যান পিটার তসোলাকিডিস ভবিষ্যতে পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনা প্রায় ১০ শতাংশ বলে অনুমান করেছেন। আবার চিকিৎসক ও গবেষকদের নিয়ে করা সাম্প্রতিক গবেষণাতেও দেখা গিয়েছে, ভবিষ্যতে সংরক্ষিত মস্তিষ্কের স্নায়বিক তথ্য কাজে লাগিয়ে পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছেন না অনেক বিশেষজ্ঞ।

কিন্তু কোনও মানুষকে ফিরিয়ে আনার পথ শুধু প্রযুক্তিগত নয়, জটিল আরও বহু কারণে। মৃত্যুর কারণটি প্রথমে সারাতে হবে। তারপর সংরক্ষণের সময় কোষ, অঙ্গ এবং মস্তিষ্কে যে ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে, তা মেরামত করতে হবে। কোটি কোটি স্নায়ুকোষের পারস্পরিক যোগাযোগ কতটা অক্ষত রয়েছে, সেটিও বড় প্রশ্ন। শেষ পর্যন্ত হৃদ্‌যন্ত্র, মস্তিষ্ক এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গকে আবার কার্যকর করে তোলার মতো প্রযুক্তি তৈরি করতে হবে। তারপরও শেষ প্রশ্নটি থেকে যাবে—ফিরে আসা মানুষটি কি আগের সেই মানুষই থাকবেন? তাঁর স্মৃতি কি থাকবে? ব্যক্তিত্ব কি একই থাকবে? আইন তাঁকে কী পরিচয়ে দেখবে? তাঁর সম্পত্তি, নাগরিকত্ব কিংবা পারিবারিক সম্পর্কের কী হবে? প্রযুক্তি যদি কোনওদিন মৃত্যুর পর সংরক্ষিত মানুষকে ফিরিয়ে আনতে পারে, তা হলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাশাপাশি আইন, দর্শন এবং সমাজব্যবস্থার সামনেও তৈরি হবে একেবারে নতুন ধরনের প্রশ্ন। হলব্রুকের সেই ধাতব পাত্রগুলির ভিতরে তাই শুধুমাত্র সাতটি দেহ পড়ে নেই। সেখানে রয়েছে মানুষের অমরত্বের পুরনো স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানের উপর এক বিশাল আস্থা। আজকের পৃথিবীতে মৃত্যু এখনও জীবনের শেষ অধ্যায়। কিন্তু ক্রায়োনিক্স সেই অধ্যায়ের শেষে একটি প্রশ্নচিহ্ন রেখে দিতে চাইছে—বিজ্ঞান ( Science) কি কোনওদিন মৃত্যুর পরেও জীবনের দরজা খুলতে পারবে? উত্তরটি হয়তো আজ নেই। হয়তো সেই উত্তর খুঁজতে আরও বহু দশক, এমনকি কয়েক শতাব্দী অপেক্ষা করতে হবে।