জঙ্গল সাফাই থেকে শুরু করে আমফানের ত্রাণ তহবিল— টাকি পুরসভার অন্দরে পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে পাহাড় প্রমাণ আর্থিক দুর্নীতি। এই সংক্রান্ত এক জনস্বার্থ মামলায় এবার টাকি পুরসভার চেয়ারম্যান, এক্সিকিউটিভ অফিসার এবং রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন দফতরকে (ডিএলবি) আলাদা আলাদাভাবে হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিল কলকাতা হাই কোর্ট। বিষয়টি খতিয়ে দেখে নগরোন্নয়ন দফতরকে দ্রুত যথাযথ পদক্ষেপ করারও নির্দেশ দিয়েছে আদালতের ডিভিশন বেঞ্চ। পরবর্তী শুনানির মধ্যে হলফনামা পেশ না করলে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে সশরীরে আদালতে হাজির হতে হবে বলেও সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
টাকি পুরসভার সদ্য ইস্তফা দেওয়া তৃণমূল কাউন্সিলর প্রদ্যুৎ দাসের দায়ের করা এই মামলার শুনানি ছিল ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চে। মামলাকারীর পক্ষে আইনজীবী ওমর ফারুক গাজী আদালতে জানান, ২০১৮-২২ অর্থবর্ষে শুধুমাত্র জঙ্গল ও ড্রেন পরিষ্কার করার নামেই ৭২ লক্ষ ৭২ হাজার টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। এই বিপুল অঙ্কের খরচ দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি।
আদালতে পেশ করা নথিতে দাবি করা হয়েছে, তৎকালীন সময়ে পুরসভায় স্থায়ী ‘বড়বাবু’ থাকা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ নিয়ম বহির্ভূতভাবে প্রবীর চট্টোপাধ্যায় নামে এক লোয়ার ডিভিশন ক্লার্কের ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ওই ৭২ লক্ষ ৭২ হাজার টাকা ঢোকানো হয়েছিল, যা পুর আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।
এখানেই শেষ নয়, আমফানের ত্রাণ তহবিলের প্রায় ৪৭ লক্ষ টাকা নয়ছয় করার অভিযোগও উঠেছে এই পুরসভার বিরুদ্ধে। উমপুন ত্রাণের সেই অর্থ টাকি পুরসভার প্রাক্তন ভাইস চেয়ারম্যান এবং ‘ফ্রেন্ডস কনস্ট্রাকশন’ নামক একটি সংস্থার অ্যাকাউন্টে কীভাবে স্থানান্তরিত হল, তা নিয়ে শুনানিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিচারপতি চক্রবর্তী। এ ছাড়া, পুরসভা এলাকায় দোকান দেওয়ার নামে আর্থিক প্রতারণা এবং একাধিক টেন্ডার প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগেও চেয়ারম্যান সোমনাথ মুখোপাধ্যায় ও ভাইস চেয়ারম্যান ফারুক গাজীর বিরুদ্ধে আদালতে নথি পেশ করা হয়েছে। শুনানির সময় টাকি পুরসভার আইনজীবী এই সমস্ত প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই শোরগোল পড়ে গিয়েছে উত্তর ২৪ পরগনার রাজনৈতিক মহলে। এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব হয়ে বিজেপি নেতা ডাঃ শৌর্য্য বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, শুধু বসিরহাট বা টাকি নয়, বাদুড়িয়া পুরসভাতেও একই রকম ভয়ানক দুর্নীতি হয়েছে। কয়েক দিন আগেই বাদুড়িয়া থেকে প্রায় তিন কোটি টাকা উদ্ধার হয়েছে। প্রশাসনের উচিত ছিল অবিলম্বে এই তিন পুরসভার দুর্নীতিগ্রস্ত চেয়ারম্যান ও অভিযুক্ত কাউন্সিলরদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ করা। রাজ্য পুর ও নগরোন্নয়ন দফতর যাতে অবিলম্বে এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে, সেই দাবিও তুলেছেন তিনি। হাইকোর্টের এই কড়া অবস্থানের পর এবার রাজ্য প্রশাসন কী পদক্ষেপ করে, সেটাই এখন দেখার।
















