কেন্দ্র ও রাজ্যের দড়ি টানাটানি ও প্রশাসনিক গাফিলতিতে রাজ্যের বেশিরভাগ স্কুলে গত তিনমাস পৌঁছয়নি মিড-ডে মিলের (Mid-Day Meal) বরাদ্দ। পাড়ার মুদিখানা থেকে ধার-দেনা করে, এমনকী প্রধান শিক্ষকদের নিজেদের পকেটের টাকায় কোনওরকমে টিমটিম করে জ্বলছিল স্কুলের উনুন। কিন্তু তিনমাস কেটে যাওয়ার পর এখন আর স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও ধারে মালপত্র দিতে রাজি নন। ফলস্বরূপ, রাজ্যের বহু স্কুলে কার্যত বন্ধের মুখে পড়ুয়াদের দুপুরের আহার। ইস্কনের আওতাধীন কলকাতার (Kolkata) গুটিকয়েক স্কুল বাদ দিলে, এই মুহূর্তে রাজ্যের বাকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় বলে অভিযোগ। 

কলকাতার ৫০০-র কাছাকাছি স্কুলে ইস্কনের মাধ্যমে মিড-ডে মিল সরবরাহ করা হলেও, রাজ্যের বাকি স্কুলগুলিতে পুরনো পদ্ধতিতেই রান্না হয়। চাল বাদে বাকি সমস্ত আনাজপাতি, মশলা ও গ্যাসের খরচ স্কুলগুলিকেই (School) মেটাতে হয় খোলা বাজার থেকে। নিয়ম অনুযায়ী, এই প্রকল্পের বরাদ্দের ৬০ শতাংশ দেয় কেন্দ্র এবং ৪০ শতাংশ দেয় রাজ্য সরকার। কিন্তু গত তিনমাস ধরে এই জোড়া বরাদ্দের কানাকড়িরও দেখা নেই। 

কলকাতার বাঙুরের নারায়ণ দাস বাঙুর মাল্টিপারপাস স্কুলের প্রধান শিক্ষক সঞ্জয় বড়ুয়ার স্পষ্ট অভিযোগ, "গত সরকারের আমলেও বরাদ্দ অনিয়মিত ছিল, কিন্তু টানা তিন মাস টাকা না পাওয়ার ঘটনা এই প্রথম। দোকানদাররা ধার দেওয়া বন্ধ করায় এখন নিজেদের পকেটের টাকায় মিড-ডে মিল চালাচ্ছি।" শুধু স্কুল কর্তৃপক্ষই নয়, মাসের পর মাস প্রাপ্য ভাতা না পেয়ে চরম দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছেন রন্ধনকর্মীরাও। 
আরও পড়ুন: অন্নপূর্ণার ফর্ম থেকে সরকারি পরিষেবা: রাজ্যজুড়ে শুরু হচ্ছে ‘সেবা সেতু অভিযান’

গ্রাম থেকে শহরতলি- সর্বত্র ছবিটা একইরকম ভয়াবহ। অবস্থা এতটাই সঙ্গিন যে, বোড়াল স্বামীজি বিদ্যাপীঠ হাই স্কুলে টাকা না-আসায় মিড-ডে মিল কার্যত বন্ধই করে দিতে হয়েছিল। পরে পুরসভার আশ্বাসে ফের তা কোনওরকমে চালু হয়েছে। এই চূড়ান্ত অব্যবস্থার শিকার হয়েছে রাজ্যের মাদ্রাসাও। রাজারহাট-বিধাননগরের বিস্তীর্ণ এলাকায় গত তিন মাস ধরে মাদ্রাসায় মিড-ডে মিলের বরাদ্দ সম্পূর্ণ বন্ধ। 

কিন্তু কেন এই অভূতপূর্ব অচলাবস্থা? প্রশাসনিক স্তরে খোঁজ নিতে গিয়ে উঠে আসছে চরম দায়সারা এক যুক্তি। সূত্রের খবর, মিড-ডে মিলের অনুদান এখন পোর্টালের মাধ্যমে ব্লক পর্যায়ে আসার কথা। কিন্তু সেই পোর্টাল নাকি আকছার অচল থাকছে! প্রযুক্তিগত এই খোঁড়া যুক্তির কারণে ব্লক স্তর থেকে স্কুলে টাকা পৌঁছচ্ছে না। রাজ্যের মিড-ডে মিল দফতরের এক কর্তার অবশ্য নির্বিকার জবাব, "পোর্টাল সংক্রান্ত সমস্যা আছে কি না, সেটা অর্থ দফতর বলতে পারবে।" এক দফতরের ঘাড় থেকে অন্য দফতরের ঘাড়ে দায় চাপানোর এই নির্লজ্জ খেলায় যখন প্রশাসন মত্ত, তখন দিনের পর দিন অভুক্ত থাকছে রাজ্যের হাজার হাজার পড়ুয়া। কেন্দ্র-রাজ্য তরজা আর 'ডবল ইঞ্জিন'-এর ফাঁপা বুলির আড়ালে গরিব ঘরের শিশুদের মুখের গ্রাস এভাবেই কেড়ে নেওয়া হবে কি না, সেটাই এখন সবথেকে বড় প্রশ্ন।