আদালত কোনও ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রকাশের জায়গা নয়। ন্যায়বিচারের নিরপেক্ষ জায়গা আদালত। সেই আদালতেই মহিলা বিচারকের হিজাব দেখে এক অভিযুক্ত আচমকাই ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়ে উঠে। এই ঘটনায় এবার সরব হয়েছেন শিলিগুড়ির আইনজীবীরা (Lawyer from Siliguri)। তাঁদের বক্তব্য, আদালতের ভিতরে ব্যক্তিগত ধর্মীয় আবেগ, রাজনৈতিক স্লোগান কিংবা কারও পোশাক নিয়ে মন্তব্য কোনওটাই বিচারপ্রক্রিয়ার স্বাভাবিক পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ঘটনাটিকে ‘অনভিপ্রেত’ এবং আদালতের মর্যাদার পরিপন্থী বলেই মনে করছেন আইনজীবী মহলের একাংশ।

এই ঘটনায় একের পর এক আইনজীবী তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। শিলিগুড়ি বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি উদয়শঙ্কর মালাকার (Udayshankar Malakar, President of the Siliguri Bar Association) বলেন, আদালতের এজলাসে প্রত্যেকের আচরণের ক্ষেত্রেই সংযম এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি। সেখানে এই ধরনের ঘটনা একেবারেই কাম্য নয়। তাঁর কথায়, আদালত চাইলে বিষয়টি নিয়ে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে পদক্ষেপ করার ক্ষমতাও রাখে। এমনকি এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আদালতে শৃঙ্খলা ভঙ্গ হয়েছে এই প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট করে তুলেছেন পশ্চিমবঙ্গ বার কাউন্সিলের সদস্য তথা শিলিগুড়ি মহকুমা আদালতের আইনজীবী অলকেশ চক্রবর্তী (Alokesh Chakraborty, a lawyer at the Siliguri Sub-divisional Court)। তাঁর বক্তব্য, “আদালতে সবসময় নির্দিষ্ট প্রোটোকল মেনে চলা বাধ্যতামূলক। বিচারক হোক বা বিচারপ্রার্থী, কারও পোশাক দেখে কটূক্তি বা মন্তব্য করা সম্পূর্ণ অনুচিত।”

আরও পড়ুন: আগেই পর্দাফাঁস করেছিলেন কুণাল! কৃষি সমবায় ঋণ-কাণ্ডে এবার স্নেহাশিসের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিশনের

অন্যদিকে অল ইন্ডিয়া লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের দার্জিলিং জেলা সম্পাদক দিবাকর রায়ও (Dibakar Roy, Darjeeling District Secretary of the All India Lawyers' Association) একই কথা বলেছেন। তীব্র নিন্দা করে তিনি বলেন, “আদালতের এজলাস রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিতর্কের ঊর্ধ্বে নিরপেক্ষ বিচার প্রদানের এক পবিত্র স্থান। সেখানে দাঁড়িয়ে কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় স্লোগান তোলা অথবা মন্তব্য করা পুরোপুরি বেআইনি।”

ঘটনার সূত্র ধরে আইনজীবীদের বক্তব্যে আরও একবার সামনে এসেছে এজলাসের নিরপেক্ষতার প্রশ্ন। ২০১৮ সালের একটি আন্তঃধর্মীয় বিয়েকে ঘিরে হওয়া পুরনো মামলায় হাজিরার সময় বুধবার শিলিগুড়ি মহকুমা আদালতের ৪ নম্বর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে এই ঘটনা ঘটে। অভিযুক্তদের উপস্থিতি যাচাইয়ের সময় এক ব্যক্তি মহিলা বিচারকের পরনে থাকা হিজাবের দিকে তাকিয়ে ‘জয় শ্রীরাম’ বলেন বলে অভিযোগ। ঘটনায় সাময়িক অস্বস্তি তৈরি হলেও তাঁর আইনজীবী ত্রিদীপ সাহা সঙ্গে সঙ্গে আদালতের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেন। এরপর অবশ্য শুনানির কাজে আর কোনও বিঘ্ন ঘটেনি।

আরও পড়ুন: মমতা তৃণমূলের ৪ অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ মামলায় হস্তক্ষেপে সুপ্রিম-না! বহাল হাই কোর্টের নির্দেশই

তবে এই ঘটনার সাফাই দিয়েছেন অভিযুক্তের আইনজীবী। তাঁর দাবি, তাঁর মক্কেল বিচারককে লক্ষ্য করে ওই স্লোগান দেননি। সাধারণভাবে কথা বলতে গিয়ে নাম ডাকার সময় বিভ্রান্ত হয়ে তিনি তা বলে ফেলেন। বিষয়টি বুঝতে পেরেই আদালতে ক্ষমা চাওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। যদিও এই ব্যাখ্যার পাশাপাশি আইনজীবী মহলের বক্তব্য স্পষ্ট আদালতের এজলাসে ব্যক্তিগত ধর্মীয় আবেগের প্রকাশ নয়, বরং বিচারপ্রক্রিয়ার শৃঙ্খলা এবং মর্যাদাই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।