বাড়ি কোথায় জিজ্ঞাসা করলে কখনও বলত ঘুটিয়ারি শরিফ, আবার পরক্ষণেই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে জানাত, সে জানে না। তবে নিজের পরিচয় পুরোপুরি হারিয়ে ফেলা চার বছরের শিশুটির কাছে একটি কথাই ছিল স্পষ্ট— মায়ের নাম হাসিনা বিবি। একরত্তির মুখে শোনা সেই নামটুকুকে সম্বল করেই তদন্তে নেমেছিল মগরাহাট থানার পুলিশ। অবশেষে ফেসবুকের সূত্র ধরে প্রায় ছ’দিন পর হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে ফিরে পেলেন মা-বাবা। কোলে সন্তানকে ফিরে পেয়ে আনন্দাশ্রু বাঁধ মানল না পরিবারের।
রেল চত্বরে কান্নার সূত্রপাত গত ২১ সেপ্টেম্বর। মগরাহাট স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ছোট্ট আরমানকে একা দাঁড়িয়ে কাঁদতে দেখে সন্দেহ হয় নিত্যযাত্রীদের। আশপাশে অভিভাবক বা পরিচিত কাউকে না পেয়ে তাঁরাই খবর দেন থানায়। পুলিশ গিয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তার ঠিকানা নিয়ে। চার বছরের শিশুর পক্ষে নিজের সঠিক এলাকা বা বাড়ির হদিস দেওয়া সম্ভব ছিল না। তবে সে স্পষ্ট ভাষায় বারবার উচ্চারণ করছিল মায়ের নাম।
পরিবারের সন্ধান মেলার আগে পর্যন্ত আরমানের স্থায়ী ঠিকানা হয়ে ওঠে মগরাহাট থানার ওসির ঘর। থানার বড়বাবু সজল কুমার রায়ের স্নেহের পরশে একাকীত্বের ভয় ভুলেছিল খুদে। ওসির মোবাইল ফোনে কার্টুন দেখা, পুলিশকর্মীদের কোলে-পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়ানো আর খাওয়াদাওয়া— এই ভাবেই থানার অন্দরে সকলের আদরের পাত্র হয়ে উঠেছিল সে। ডিউটির ব্যস্ততার মাঝেই যেন অন্য এক টান তৈরি হয়েছিল একরত্তির সঙ্গে।
তবে দায়িত্বের কথা ভোলেনি পুলিশ। ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার বিভিন্ন প্রান্তে বার্তা পাঠানোর পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম ও সমাজমাধ্যমের সাহায্য নেওয়া হয়। ফেসবুকের নানা পেজ ও গ্রুপে আরমানের ছবি এবং মায়ের নামটি ছড়িয়ে দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত সেই সামাজিক মাধ্যমেই মিলল আসল হদিস। গত ২৯ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে ঘুরে বেড়ানো ছবির দিকে চোখ পড়তেই চমকে ওঠেন হাসিনা বিবি। নিজের হারিয়ে যাওয়া মানিককে চিনতে এক মুহূর্তও ভুল হয়নি তাঁর। জানা যায়, গত ২১ সেপ্টেম্বর শিয়ালদহ-ডায়মন্ড হারবার শাখার ট্রেনে পরিবারের সঙ্গেই ছিল আরমান। ভিড়ের চাপে কোনও ভাবে বাবা-মায়ের হাত ফস্কে নেমে পড়ে মগরাহাট স্টেশনে। তার পর থেকে হন্যে হয়ে ছেলেকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল পরিবার।
ছেলের খোঁজ মেবামাত্রই ওই দিন সন্ধ্যায় পরিজনদের নিয়ে মগরাহাট থানায় পৌঁছন মা-বাবা। প্রয়োজনীয় নথি ও পারিবারিক তথ্য যাচাইয়ের পর একরত্তি আরমানকে তুলে দেওয়া হয় পরিবারের কোলে। কান্নায় ভেঙে পড়েন মা হাসিনা বিবি। খুদেকে বিদায় জানানোর মুহূর্তে কিছুটা মনভার হয়েছিল থানা চত্বরেরও, তবে দায়িত্ব সফলভাবে পূরণ করতে পেরে স্বস্তিতে পুলিশকর্মীরা। শুধু মায়ের নাম আঁকড়ে ধরে নিখোঁজ শিশুকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার এই মানবিক পদক্ষেপে মগরাহাট পুলিশের প্রশংসায় পঞ্চমুখ স্থানীয় বাসিন্দারা।
















