কলকাতার সরকারি ও সরকার-পোষিত স্কুলগুলির মিড ডে মিলের দায়িত্ব ইসকনের হাতে তুলে দেওয়ার রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে তৈরি হয়েছে জোর বিতর্ক। এই সিদ্ধান্তের ফলে একদিকে যেমন স্কুলপড়ুয়াদের খাবারের তালিকা থেকে ডিম বাদ পড়ায় তাদের পুষ্টির মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তেমনই অন্য দিকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন এই পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষ। সংশ্লিষ্ট মহলের আশঙ্কা, সরকারের এই পদক্ষেপ শুধু পুষ্টিতেই নয়, বড় আঘাত হানতে চলেছে প্রান্তিক মানুষের কর্মসংস্থানেও। 

সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, কলকাতা পুর এলাকার প্রায় ১,৮০০টি সরকারি ও সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলের মিড ডে মিলের রান্না ও সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে ইসকনকে। তাদের কেন্দ্রীয় রান্নাঘর বা সেন্ট্রাল কিচেন থেকে এই খাবার সরবরাহ করা হবে। ইসকনের নিজস্ব ধর্মীয় ও আদর্শগত রীতিনীতি মেনে এই খাবারে কোনওরকম আমিষ উপাদান থাকবে না। ডিমের বিকল্প হিসেবে সয়াবিন, পনির, রাজমা ও ডালজাতীয় খাবার পরিবেশন করা হবে বলে জানানো হয়েছে। আর এই মেনু বদল নিয়েই আপত্তি তুলেছেন পুষ্টিবিদ ও আন্দোলনকারীদের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, বাড়ন্ত বয়সের শিশুদের জন্য ডিম অত্যন্ত সাশ্রয়ী এবং সহজলভ্য প্রাণিজ প্রোটিনের উৎস। ডাল বা সয়াবিন দিয়ে সেই ঘাটতি পুরোপুরি মেটানো সম্ভব নয়। পুষ্টির মতো সংবেদনশীল বিষয়ে কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা আদর্শগত সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া অনুচিত বলেই তাঁদের মত। 

বিতর্কের অন্য বড় দিকটি হলো কর্মসংস্থান। এতদিন ধরে স্কুলভিত্তিক রান্না ও খাবার পরিবেশনের মূল দায়িত্ব সামলাতেন স্থানীয় বিভিন্ন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যরা এবং মিড ডে মিল কর্মীরা, যাঁদের সিংহভাগই অত্যন্ত দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের মহিলা। রান্না কেন্দ্রীভূত হয়ে ইসকনের হাতে চলে গেলে এই আড়াই লক্ষেরও বেশি কর্মীর একটি বড় অংশ কাজ হারাবেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর কর্মীদের অভিযোগ, এই সিদ্ধান্তের ফলে তাঁদের রুটিরুজিতে টান পড়বে এবং তাঁরা চরম আর্থিক অনটনের মুখে পড়বেন। 

আন্দোলনকারীদের দাবি, সরকার পুষ্টি ও গরিব মানুষের কর্মসংস্থান— দুই ক্ষেত্রেই আপোস করে একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে। যেখানে মিড ডে মিল প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই ছিল শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় স্তরে কর্মসংস্থান তৈরি করা, সেখানে এই নতুন ব্যবস্থা গ্রামীণ ও শহরতলির শ্রমজীবী মহিলাদের উপার্জনের পথকে কার্যত বন্ধ করে দেবে। এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে ইতিমধ্যেই সরব হয়েছেন বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন ও সমাজকর্মীরা।