শুভেন্দু অধিকারী(Suvendu Adhikari)। দেশে এতো মুখ্যমন্ত্রী রয়েছেন, কিন্তু চর্চা তাঁকে নিয়েই। কেন? কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয় করে অগাধ প্রশাসনিক দক্ষতায় কীভাবে উন্নয়নের কাজ করতে হয়, তার উদাহরণ তৈরি করেছেন বিজেপি শাসনের সাড়ে পাঁচ মাসেই।
কিন্তু এমন তো নয়, যে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেই তাঁর জ্ঞানচক্ষুর উন্মীলন হয়েছে! আসলে ৫৬ বছরের শুভেন্দু বিগত ৩০ বছর ধরে এই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর যে অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার তিনি উজাড় করে দিচ্ছেন। প্রাশাসনিক অভিজ্ঞতার তালিকাটা তাঁর দীর্ঘ। পুর-রাজনীতি দিয়ে শুরু। তারপর দীর্ঘদিনের সাংসদ। এলাকা ধরে ধরে উন্নয়ন করেছেন। যেটা পেরেছেন, তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যেটা পারবেন না, সেটাও স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন। মানুষের সঙ্গে তঞ্চকতা করেননি। এরপর বিধায়ক হয়ে রাজ্যের মন্ত্রী, একাধিক দায়িত্ব। ভিন্নমুখী কর্মপরিধি। শুভেন্দু তাঁর প্রায় এক দশকের দফতর সামলানোর ক্ষেত্রে অন্য অনেকের থেকে কয়েক যোজন এগিয়ে ছিলেন। কেন? শুভেন্দু মাটির গন্ধ বুঝতেন, বোঝেনও। ছাত্র, যুব রাজনীতির পাশাপাশি দলের তরফে একাধিক সাংগঠনিক দায়িত্ব তাঁকে দড় করেছে, শিখিয়েছে, আর অনুভব করেছেন, কোথায় জনমুখী কাজ করতে গিয়ে লাল ফিতের বাঁধনে আটকে গেলে সাহসী হয়ে দায়িত্ব নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ, দিনের শেষে মানুষের কাছে জবাব তাঁকেই দিতে হয়েছে, হবেও। তৃণমূল আমলের বহু মন্ত্রীর দফতর নিয়ে অভিযোগ থাকতে পারে, কিন্তু যতদিন তিনি যে দফতর চালিয়েছেন, কোথাও একটি প্রশ্নও ওঠেনি।
রাজনীতির পাকেচক্রে শুভেন্দু এরপর বিরোধী দলনেতা। সেটাও পূর্ণমন্ত্রীর পদ। টানা পাঁচ বছর। বিরোধী বেঞ্চে বসে আরও সুবিধা হল। মানুষের আরও কাছাকাছি, অভাব, অভিযোগ, প্রয়োজন, এবং রাজনীতির জাঁতাকলগুলো অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝেছেন। এই জাঁতাকলের মধ্যেও কৌশলে মানুষের দাবি আদায়ের জায়গাগুলো নিজের বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে বের করলেন, লালন করলেন এবং তা প্রয়োগ করলেন।
দীর্ঘ এই প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাকে সঙ্গে নিয়েই শুভেন্দু অধিকারী এখন মুখ্যমন্ত্রী। বুঝেছেন আমলাতন্ত্র, জানেন সরকার চালানোর ঝক্কি। জানেন মন্ত্রিসভায় নানা চোরাস্রোত, আবার অনুভব করছেন দিল্লি-বাংলার ব্যালেন্সের খেলাটাও সামলাতে হবে তাঁকেই। কেউ বলুক আর না বলুক, শুভেন্দু যেভাবে চলতে চান অনেক মন্ত্রিসভার সদস্য সেভাবে চলতে চান না। তাদেরও নানা 'জ্যাক' রয়েছে। দিল্লির নেতৃত্বের অনেক সিদ্ধান্তই চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বাংলার উপর। শুভেন্দু বোঝেন, অন্য রাজ্যে যা সম্ভব, তা বাংলায় সম্ভব নয়। আলাদা মাটি, আলাদা ঐতিহ্য, আলাদা সংস্কৃতি। কোথাও দেখা যাচ্ছে দিল্লির নেতৃত্ব বাংলার আমলাদের উপর প্রভাব বিস্তার করছেন। শুভেন্দু চাইছেন না এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। বুদ্ধিমান শুভেন্দু সেই আক্রমণকেও মেসির ডজে কাটিয়ে পাল্টা চাল দিচ্ছেন। সবই হচ্ছে নিশ্চুপে, নিস্তরঙ্গ গতিতে। জানেন শুধু তিনিই। এ হচ্ছে ঘরের যুদ্ধ।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু একটা একটা করে প্রকল্প ধরছেন। তাড়াহুড়ো নয়। প্রয়োগের পর ভুলগুলো শোধরাচ্ছেন। তার সঙ্গে সরকারের শিল্পায়ন আর কর্মসংস্থান। মিথ্যাচারের কর্মসংস্থানের বুলি তাঁর মুখে নেই। শিক্ষকের চাকরির পরীক্ষা ফের শুরু করছেন, পাশাপশি পুরনো জটিলতা তথা চাকরিহারাদের সমস্যা আইনি পথে ঠিক করছেন। প্রয়োজনে কোর্টের কাছে সময় চাইছেন। হ্যাঁ, পুলিশের কাজ নিয়ে কিছু প্রশ্ন আছে। কিন্তু শুভেন্দু জানেন এটা ঘুঘুর বাসা। অনেক ঘটনা ঘটছে-- যেমন বিরোধীদের সভায় হামলা, অন্যায় গ্রেফতার, সবটাই করছে এলাকার অতি উৎসাহী নেতারা। দলের সভাপতিকে বারবার বলছেন, এসব বন্ধ করতে, লাগাম দিতে। কিছুটা পেরেছেন। প্রচেষ্টা অব্যাহত।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর সাড়ে পাঁচ মাসের সরকার। দলের কাজ বা অন্য মন্ত্রীদের কাজ নিয়ে বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ জমা হয়েছে। কিন্তু শুভেন্দুর বিরুদ্ধে বলার মতো অভিযোগ খুঁজতে গেলে বিরোধীদের বহু কসরৎ করতে হবে। বিজেপির দিল্লির নেতা ও দলের কিছু কট্টরপন্থীদের খেয়াল খুশি মতো বাংলাকে চালানোর চেষ্টাকে ভাঙছেন অভিজ্ঞতা আর বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে। ফলে বিজেপির ছায়া শুভেন্দুর উপর নয়, বাংলায় এখন শুভেন্দুর ছায়া ক্রমশ বিস্তারিত হচ্ছে বিজেপির উপর।















