ব্লেড দিয়ে বুক চিরে বের করা হয় রক্ত। সেই রক্তেই হয় দেবীর আরাধনা। অষ্টমীর সন্ধিক্ষণে দেবীর পা থেকে ফুল পড়ার অপেক্ষা, আর সেই ফুল মাটিতে পড়লেই শুরু হয় মায়ের জয়গান। এমনই এক প্রাচীন রীতি, বিশ্বাস আর কঠোর নিয়মে আজও নিষ্ঠার সঙ্গে হয়ে আসছে অন্ডালের (Andal) দক্ষিণখণ্ড এলাকার ভট্টাচার্য বাড়ির দুর্গাপুজো (Durga Pujo)। প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো এই পুজোয় দেবী (400 Years Old Durga Pujo) পরিচিত ‘খ্যাপা মা’ নামে।  এই পুজোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাজপরিবার, জঙ্গল কেটে বসতি গড়া, অলৌকিক স্বপ্নাদেশ এবং দেবীর শাঁখা পরার এক আশ্চর্য কাহিনি। জানা যায়, গঙ্গাধর ভট্টাচার্য ছিলেন এই পুজোর প্রতিষ্ঠাতা। সে সময় তাঁরা বর্ধমান রাজার পুরোহিত ছিলেন। রাজার সঙ্গে মনোমালিন্যের পর গঙ্গাধর ভট্টাচার্য গড়জঙ্গলে এসে বসতি গড়েন। পরে শেরগড়ে জঙ্গল কেটে স্থায়ীভাবে বসতি তৈরি করেন। সেখানেই প্রতিষ্ঠা করেন দুর্গাপুজো। পরে সেই এলাকা উখড়া নামে পরিচিত হয়। 

আরও পড়ুন: সীমান্ত পারাপার মামলায় ফরাসি শরণার্থীকে জামিন কলকাতা হাই কোর্টের


দেবীর নাম ‘খ্যাপা মা’ কেন? পরিবারের বিশ্বাস, দেবী এখানে ঘরের মেয়ে হিসেবেই পূজিতা হন। তবে মায়ের পুজোয় নিয়মের এতটাই কড়াকড়ি যে সামান্য ত্রুটি বা গোলযোগও পরিবারের কাছে অমঙ্গলসূচক বলে মনে করা হয়। দেবীর এই রুষ্ট হওয়ার ভাব এবং কঠোর নিয়ম মেনেই তাঁর নাম হয়ে যায় ‘খ্যাপা মা’। এই পুজোর অন্যতম কঠিন নিয়ম শুরু হয় কৃষ্ণানবমী থেকেই। দেবীর বোধনের পর থেকে পরিবারের সদস্যরা নিরামিষ আহার করেন। শুধু তাই নয়, পরিবারের সদস্যরা বাইরের জলও পান করেন না। মায়ের ভোগ রান্নার ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ বিধি। পরিবারের মহিলারাই ভোগ রান্না করেন। বাইরের কারও স্পর্শ সেই রান্নাঘরে চলে না। কৃষ্ণানবমী থেকেই শুরু হয় অন্নভোগ। খিচুড়ি, পোলাও, লুচি, তরকারি, সুজি, নিমকি, কচুরি-সহ একাধিক নিরামিষ পদে সাজানো হয় মায়ের ভোগ। আর প্রতিমাতেও রয়েছে বিশেষ বৈশিষ্ট্য। প্রচলিত রীতির বিপরীতে এখানে দেবীর বাঁ দিকে থাকেন লক্ষ্মী ও গণেশ।‌ তবে এই পুজোর সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং রোমহর্ষক মুহূর্ত আসে অষ্টমীর সন্ধিক্ষণে। 


পরিবারের পৈতেধারী পুরুষরা নিজেদের বুক চিরে রক্ত দিয়ে দেবীর আরাধনা করেন। বর্তমান পূজারির পাশাপাশি পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মও এই রীতিতে অংশ নেন। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই রক্তদানের রীতি আজও ভক্তি ও বিশ্বাসের সঙ্গে পালন করা হয়। আর অষ্টমীর সন্ধিক্ষণের সেই মুহূর্তকে ঘিরে রয়েছে আরও এক বিশেষ রীতি ‘ঝড়ন্তি’। দেবীর পায়ে রাখা হয় ১০৮টি বেলপাতা। তার ভিতরে পদ্মকুঁড়ি, তার ভিতরে লাল শালুক এবং একেবারে ভিতরে রাখা হয় ‘অক্ষত্র’। আটটি দুর্বা, আতপ চাল সহ নানা উপকরণ আলতা পাতায় মুড়ে তৈরি করা হয় এই অক্ষত্র। দেবীর পা থেকে সেই ফুল নিচে পরে। সেই ভুল কাছে রাখলে মনস্কামনা পূরণ হয়। বর্তমানে শুকো পুকুরে সম্পন্ন হয় বিসর্জনের রীতি। 
পরিবারের সদস্য শর্মিষ্ঠা ভট্টাচার্য বলেন, “প্রায় ৪০০ বছর ধরে আমাদের বাড়িতে এই পুজো হয়ে আসছে। মাকে আমরা ঘরের মেয়ে হিসেবেই পুজো করি। মায়ের পুজোয় নিয়মের কোনও ত্রুটি যেন না হয়, সেদিকেই পরিবারের সকলের নজর থাকে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে সমস্ত রীতি চলে আসছে, আজও সেই একই নিয়ম মেনে মায়ের পুজো করা হয়। এই পুজোর সঙ্গে আমাদের পরিবারের আবেগ, বিশ্বাস এবং ঐতিহ্য জড়িয়ে রয়েছে।”