রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে কীভাবে একটি অণুর দুটি 'মিরর-ইমেজ' বা দর্পণ-প্রতিবিম্ব সদৃশ রূপের মধ্যে একটিকে অন্যটির চেয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া সম্ভব-তা আবিষ্কারের জন্য দুই রসায়নবিদ পেলেন নোবেল পুরস্কার। ২০২৬ সালের রসায়নে যৌথ ভাবে নোবেল পুরস্কার পেলেন দুই বিজ্ঞানী- হেনরি বি কাগান (Henri B Kagan) ও কেনসো সোয়াই (Kenso Soai)। রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস এই পুরস্কারের জন্য তাঁদের নাম ঘোষণা করেছে।

অসাম্য জৈব সংশ্লেষ বা অ্যাসিমেট্রিক অর্গানিক সিন্থেসিসে 'নন-লিনিয়ার ইফেক্ট' এবং 'অটোক্যাটালিসিস' বা স্ব-অনুঘটন আবিষ্কারের জন্য হেনরি বি কাগান ও কেনসো সোয়াইকে এই নোবেল দেওয়া হয়েছে। 

আরও পড়ুন: সিঙ্গাপুরে দুর্গাপুজোর ৭০ বছর, শিকড় থেকে শিখরে এক টুকরো বাংলা

বিজ্ঞানী হেনরি কাগান রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের এমন একটি নতুন কৌশল উদ্ভাবন করেছেন, যার মাধ্যমে আগে যা সম্ভব বলে মনে করা হত তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে অণুর একটি নির্দিষ্ট প্রতিবিম্ব রূপ তৈরি করা যায়। তাঁর এই আবিষ্কার ওষুধ, প্রসাধন, সুগন্ধি এবং নতুন প্রযুক্তিগত উপাদান তৈরির রাসায়নিক বিক্রিয়াকে বহুগুণ সহজ ও কার্যকর করেছে। 

অন্য দিকে, বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই এমন একটি ঐতিহাসিক রাসায়নিক বিক্রিয়ার নকশা তৈরি করেছেন, যা 'সোয়াই রিঅ্যাকশন' নামে পরিচিত। প্রকৃতি বা জীবদেহের বাইরে, গবেষণাগারে অন্য রূপটি ছাড়া কেবল একটি নির্দিষ্ট দর্পণ-প্রতিবিম্ব তৈরি করার এই সাফল্য আগে আর কেউ অর্জন করতে পারেননি।

অ্যাকাডেমির প্রেস বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অ্যামাইনো অ্যাসিডের মতো কিছু অণুর দু'টি প্রতিরূপ পাওয়া যায়। একটি অপরটির প্রতিফলন, যেমন আমাদের দুই হাত। বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলে নন-সুপারইম্পোজেবল মিরর ইমেজ। একটি প্রতিরূপ ডানহাতি (ডি-আইসোমার) এবং অন্যটি বাঁহাতি (এল-আইসোমার)। 

দেহকোষের প্রোটিনে অ্যামাইনো অ্যাসিডের একটি প্রতিরূপই পাওয়া যায়। অন্যটিকে প্রকৃতিতে প্রায় দেখাই যায় না। কিন্তু পরীক্ষাগারে দু'টি প্রতিরূপ তৈরি হয় সমান পরিমাণে। যাকে বলা হয় রেসমিক মিশ্রণ। কিন্তু ঘটনা হল, মানব শরীর কেবল একটি নির্দিষ্ট আইসোমারই গ্রহণ করে। সেটাই ওষুধ প্রস্তুতের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তার 'মিরর' রূপটি মানব শরীরের জন্য ক্ষতিকর এমনকি প্রাণঘাতী বিষও হতে পারে। কৃত্রিম ভাবে কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রতিরূপ  তৈরি করার প্রক্রিয়াই হল অপ্রতিসম জৈব সংশ্লেষ।

সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, কোনও রাসায়নিক বিক্রিয়ায় যদি ২০ শতাংশ বিশুদ্ধ ক্যাটালিস্ট বা অনুঘটক ব্যবহার করা হয়, তবে উৎপাদিত পদার্থটিও ২০ শতাংশ বিশুদ্ধ হওয়ার কথা। কিন্তু কাগান দেখান যে, রসায়নে সবসময় এমনটা ঘটে না। তিনি আবিষ্কার করেন, খুব কম বিশুদ্ধ অনুঘটক ব্যবহার করেও বিক্রিয়া শেষে প্রায় ১০০ শতাংশ বিশুদ্ধ এবং একক রূপের (ডি-আইসোমার বা এল-আইসোমার) অণু তৈরি করা সম্ভব।

এমন ক্ষেত্রে অনুঘটকের অণুগুলি নিজেদের মধ্যে জোট বেঁধে বিশেষ আচরণ করে, যা বিক্রিয়াতে নতুন মাত্রা দেয়। একেই বলে নন-লিনিয়ার বা অ-সরলরৈখিক প্রভাব। এর ফলে কম খরচে, সহজ পদ্ধতিতে ওষুধ ও অন্য রাসায়নিক তৈরি করা সম্ভব হয়। সাধারণত একটি রাসায়নিক বিক্রিয়ায় গতি দ্রুত বা মন্থর করার জন্য বাইরে থেকে অনুঘটক যোগ করতে হয়। কিন্তু অটোক্যাটালিসিস হল এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে বিক্রিয়ায় উৎপন্ন পদার্থটি নিজেই নিজের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। জাপানি বিজ্ঞানী সোয়াই এমন একটি বিক্রিয়া আবিষ্কার করেন, যেখানে খুব সামান্য পরিমাণ হোমোচাইরাল অণু উপস্থিত থাকলেও, সেটি অটোক্যাটালিসিস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজের মতো কোটি কোটি অণু তৈরি করে ফেলে। রসায়নশাস্ত্রে এই বৈশিষ্ট্যকে বলে হোমোচাইরালিটি। গ্রিক ভাষায় 'হোমো' মানে সম এবং 'চাইরাল' মানে হাত। 

নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী কাগান যুক্ত রয়েছেন প্যারিস-সাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। অন্যদিকে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের যুক্ত রয়েছেন ৯৫ বছর বয়সি বিজ্ঞান সোয়াই। তাঁদের গবেষণার বিষয় ছিল 'ডিসকভারি অফ নন লিনেয়ার এফেক্টস অ্যান্ড অটোক্যাটালিসিস ইন অ্যাসিমেট্রিক অর্গ্যানিক সিন্থেসিস।' রাসায়নিক বিক্রিয়ার অজানা দিকগুলি নিয়ে কাজ করেছেন দুই বিজ্ঞানী। জানা গিয়েছে, কাগানের এই গবেষণায় প্রবলভাবে উপকৃত হবে চিকিৎসাক্ষেত্র। রাসায়নিক বিক্রিয়া সংক্রান্ত সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে নতুন ওষুধ তৈরি করা যেতে পারে। অন্যদিকে, সোয়াইয়ের গবেষণায় উঠে এসেছে এমন রাসায়নিক তথ্য যা গোটা বিশ্বে আজ পর্যন্ত কোনও বিজ্ঞানী সংগ্রহ করতে পারেনি।

আরও পড়ুন: রাশিয়ার কৃষ্ণসাগর উপকূলে তেলবাহী ট্যাঙ্কারে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা! চলছে উদ্ধারকাজ

হেনরি বি কাগানের জন্ম ১৯৩০ সালের ১৫ ডিসেম্বর। বর্তমানে ফ্রান্সের 'ইউনিভার্সিটি প্যারিস-স্যাক্লে'-র রসায়ন বিভাগের এমিরেটাস অধ্যাপক। তাঁকে অ-সরলরৈখিক অনুঘটক সংক্রান্ত পরীক্ষার পথিকৃৎ হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর আবিষ্কার ওষুধ প্রস্তুতকারক শিল্পের উন্নতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে। কেনসো সোয়াইয়ের জন্ম ১৯৫০ সালে। তিনি জাপানের 'টোকিয়ো ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স'-এর ফলিত রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক।

পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লক্ষ সুইডিশ ক্রোনা, ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ১০ কোটির কাছাকাছি।