শরতের আবহে সিঙ্গাপুরের ব্যস্ত নগরজীবনের মধ্যে এ বছর আরও একবার উঁকি দিচ্ছে মহিষাসুরমর্দিনীর সুর। এবছর সিঙ্গাপুরের শারদোৎসব পা দিলো ৭০ বছরে। কয়েক দিনের জন্য বদলে যায় শহরের পরিচিত ছন্দ। ঢাকের শব্দ, ধুনোর গন্ধ, শিউলির স্মৃতি, অঞ্জলির মন্ত্রোচ্চারণ আর পুজোর পরের অনিবার্য আড্ডা সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অন্যরকম আবহ। মনে হয়, ভৌগোলিক দূরত্ব যেন হঠাৎ করেই গুরুত্ব হারিয়েছে। কলকাতা কিংবা বাংলার কোনও পুজোমণ্ডপ যেন দূরদেশ পেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে সিঙ্গাপুরের মাটিতে।
আরও পড়ুন: চন্দননগরে রাস্তা আটকে মোদির নামে আলপনা, প্রতিবাদ করতে গিয়ে আক্রান্ত আইনজীবীরা!
সিঙ্গাপুরে বসবাসকারী বাঙালিদের কাছে দুর্গাপুজো তাই শুধুই একটি ধর্মীয় উৎসব নয়। এটি ঘরে ফেরার অনুভূতি, নিজের শিকড়কে ছুঁয়ে দেখার মুহূর্ত এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে একই সাংস্কৃতিক সুতোয় বেঁধে রাখার এক অনন্য সামাজিক পরিসর। এই দীর্ঘ পথচলার অন্যতম সাক্ষী Bengali Association Singapore (BAS)। সাত দশকের পথ পেরিয়ে BAS-এর দুর্গাপুজো আজ শুধু একটি কমিউনিটি উৎসব নয়, সিঙ্গাপুরের বহুসাংস্কৃতিক জীবনেরও একটি পরিচিত অংশ।
ছোট্ট উদ্যোগ থেকে সাত দশকের ঐতিহ্য আজকের পুজোর গল্প।এই পুজোর গল্পের শুরুটা ছিল অনেকটাই জৌলুসহীন। আজকের ঝলমলে আয়োজন, বিপুল মানুষের সমাগম কিংবা নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সঙ্গে সেই শুরুর দিনের ছবি মেলানো কঠিন। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের সিঙ্গাপুরে বাঙালি সম্প্রদায় নেই বললেই চলে । হাতে গোনা কিছু পরিবার, সীমিত পরিসরের সামাজিক যোগাযোগ এবং নতুন দেশে নিজেদের জায়গা তৈরি করার নিরন্তর চেষ্টা,এই নিয়েই তখনকার বাস্তবতা।
১৯৫৬ সালে BAS-এর সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত হয়। প্রায় ৫০টি স্থানীয় বাঙালি পরিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই সংগঠনের লক্ষ্য ছিল শুধুমাত্র একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন তৈরি করা নয়। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কল্যাণ, শিক্ষা, বিনোদন, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং নতুন দেশে বসবাসকারী বাঙালিদের জন্য একটি শক্তিশালী সামাজিক পরিসর তৈরি করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
বিদেশের মাটিতে বসবাস করা মানুষের কাছে তখন ‘কমিউনিটি’ শব্দটির অর্থ ছিল আরও গভীর। পরিচিত মানুষ, পরিচিত ভাষা, খাবার, গান, সাহিত্য এবং উৎসব এসবই ছিল অচেনা পরিবেশে নিজের পরিচয়টুকু ধরে রাখার অবলম্বন। সেই জায়গা থেকেই দুর্গাপুজো ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে এক গুরুত্বপূর্ণ মিলনক্ষেত্র।
প্রথম দিকের পুজোর আয়োজন ছিল অনেক বেশি ঘরোয়া। সীমিত সংখ্যক পরিবার নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে নিয়ে পুজোর আয়োজন করতেন। কোথাও হয়তো ছোট পরিসরে প্রতিমা আনা হয়েছে, কোথাও রান্না হয়েছে নিজেদের হাতে, আবার কোথাও পুজোর শেষে বসেছে দীর্ঘ আড্ডা। আয়োজনের চাকচিক্য কম থাকলেও আবেগের কোনও ঘাটতি ছিল না।
বরং সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই তৈরি হয়েছিল এক বিশেষ পারিবারিক বন্ধন। একজনের বাড়িতে পুজোর প্রস্তুতি, অন্যজনের হাতে প্রসাদের দায়িত্ব, কেউ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করছেন, কেউ আবার নতুন প্রজন্মকে বাংলা গান বা কবিতা শেখাচ্ছেন এইভাবেই উৎসব হয়ে উঠেছিল সম্মিলিত উদ্যোগ।
সময়ের সঙ্গে সিঙ্গাপুরে বাঙালিদের সংখ্যা ও সামাজিক পরিসর বাড়তে থাকে। কর্মসূত্রে, শিক্ষার কারণে কিংবা ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বিভিন্ন প্রজন্মের বাঙালির আগমন ঘটে। নতুন পরিবার যুক্ত হয়, নতুন প্রজন্ম বড় হতে থাকে। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে BAS-এর কার্যক্রমও বিস্তৃত হয়।দুর্গাপুজোও ধীরে ধীরে ঘরোয়া আয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে একটি বৃহত্তর সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়।















