নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের এক ছাত্রের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। বিনা চিকিৎসায় ঘণ্টার ঘণ্টা তাকে ফেলে রাখা হয়েছিল। হাতের কাছে গাড়ি থাকা সত্ত্বেও নিয়ে যাওয়া হয়নি হাসপাতালে। এই ঘটনা নিয়ে রামকৃষ্ণ মিশনের অন্দরেই ক্ষুব্ধ দীপ্তাংশু মাহাতোর সহপাঠীরা। ৩০ জুন তাদের সহপাঠীকে তারা দেখেছে ক্রমশ মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়তে। 

এক, সহপাঠী জানিয়েছে, সকালে ক্লাস শুরু হওয়ার সময় যখন দীপ্তাংশু গরম চা খেয়ে ফেলেছিল তখন শিক্ষকের ভয়ের জেরে কিছু বলতেই পারেনি। তারপরে যখন কষ্ট বাড়তে শুরু করে তখন আমরা হাউজমাস্টারকে ঘটনা জানাই কিন্তু কোনও পাত্তা দেয়নি। 

দ্বিতীয়, সহপাঠী জানিয়েছে, হাইজমাস্টারকে বলার পর অন্য একজনের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তখন তাঁর কাছে গিয়ে যখন আমরা পুরো ঘটনার কথা জানাই তখন প্রধান শিক্ষককে জানানোর কথা বলেন। 

তৃতীয়, সহপাঠী বলে, সকাল ১০টার কিছু আগে দীপ্তাংশু এসে ঘরে শুয়ে পড়েছিল। আর শুধু তখন ওর গলা থেকে কফ উঠছিল। প্রায় হাফ বালতি মতো কফ উঠেছিল। তার কিছুক্ষণ পরই ওর বাবা আমাদের হোস্টেলে এসে পৌঁছয়। ওকে দেখে খানিকটা ভেঙে পড়েন। 

চতুর্থ, সহপাঠী জানায়, আমরা দৌড়াদৌড়ি করেও যখন কারো কাছ থেকে কোনও সাহায্য পাইনি তখন আমরা নিজেরাই অ্যাপ থেকে গাড়ি বুক করি। ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবি। মিশনের নিজেদের গাড়ি থাকা সত্ত্বেও চালক না থাকার অজুহাত দিয়ে দীপ্তাংশুকে সেই গাড়ি করে কেন তাকে কোনও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল না? 

পঞ্চম, সহপাঠি জানিয়েছে, ৪ ঘণ্টা ধরে দীপ্তাংশু বিনা চিকিৎসায় মিশনের মধ্যেই ছিল। একটা অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা পর্যন্ত করা হয়নি। এত বড় একটা ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আমাদের বারবার বলা হয়েছে এটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট। অথচ চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন যে, ঠিক সময় যদি ওর চিকিৎসা শুরু করা যেত তাহলে ওকে বাঁচানো সম্ভব ছিল। 

এতবড় একটা ঘটনা ঘটে গেল নামকরা নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের মতো একটা জায়গায় সেখানে দীপ্তাংশু যখন গরম চা খেয়ে ফেলল তখন শিক্ষককে সে এতটাই ভয় পেলে যে তার কষ্টের কথা বলতেই পারল না? মহারাজদের কাছে যাওয়ার কত নিয়ম আছে যে এই ঘটনার কথা তাদের জানানো গেল না? ঠিক সময় যদি দীপ্তাংশুর চিকিৎসা শুরু হত তাহলে তার বাবা মনোরঞ্জন মাহাতোকে অকালে সন্তান হারিয়ে ফেলতে হত না। 

দীপ্তাংশুর সহপাঠীদের দাবি, এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। কাদের জন্য এমন ঘটনা ঘটল? কেন দীপ্তাংশুর যন্ত্রণার কথা কেউ শুনতেই চাইলেন না? বাবা-মায়ের তাদের সন্তানকে সেখানে লেখাপড়া করতে পাঠায় প্রাণ হারানোর জন্যে? এতকিছুর পরে প্রধান শিক্ষকের ইস্তফা এবং ৩ অভিযুক্তকে সাসপেন্ড করা শুধুমাত্র মিশনের মুখরক্ষার চেষ্টা ছাড়া আর যে কিছুই নয় তা স্পষ্ট।

দীপ্তাংশু মাহাতোর পরিবারের অভিযোগ, ৩০ জুন গরম চা পান করে ফেলে সে। গরম চায়ে তার খাদ্যনালি ও অভ্যন্তরীণ অংশ মারাত্মকভাবে পুড়ে যায়। সে তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে ওয়ার্ডেনের কাছে গেলেও বিষয়টিকে শুনতেই চায়নি। চিকিৎসক তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে বললেও মিশন কর্তৃপক্ষ গা ঢিলেমি দেয়। দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা বিনা চিকিৎসায় তাকে ফেলে রাখা হয়। অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে মিশন কর্তৃপক্ষ দীপ্তাংশুকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ন্যূনতম তাগিদটুকুও দেখায়নি বলে অভিযোগ। পরিবর্তে তার বাবাকে ফোন করে বলা হয়, ছেলে অসুস্থ, আপনারা এসে হাসপাতালে নিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত অচৈতন্য অবস্থায় তাকে বাইপাসের ধারের এক বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ওই কিশোর।