কলকাতার পার্ক স্ট্রিট (Park Street Kolkata) আর বড়দিনের (Christmas Festival) আলো ঝলমল সন্ধ্যা যেন সমার্থক শব্দ। বিগত বছরগুলিতে ক্রিসমাসের আনন্দে মাতোয়ারা মহানগরীর এই চেনা ছবি বারবার বুঝিয়েছে এই শহর যেমন দুর্গাপুজোয় জনজোয়ারে ভেসে যায়, ঠিক তেমনভাবেই সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদকে চৌহদ্দির বাইরে পাঠিয়ে খুব সহজেই যিশুবন্দনার আনন্দে প্রিয়জনদের নিয়ে সামিল হতে পারে ক্যারলের সুর আর প্লাম কেকের সুবাসে। আলো ঝলমল পার্কস্ট্রিটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে যেতে পারে অনায়াসে। কিন্তু এখন বদলের বাংলা। গেরুয়া বঙ্গে অ্যালেন পার্কে গৈরিকীকরণ। কলকাতার অন্যতম ঐতিহ্যশালী উৎসবের ঠিকানায় এবার কার্যত জোর করেই দুর্গাপুজোর (Durga Puja in Allen Park) আয়োজন করতে চলেছে বিজেপি (BJP), এমনই অভিযোগ উঠেছে।নেপথ্যে, 'কলকাতা সনাতনী সঙ্ঘ' এবং গেরুয়া শিবিরের দাপুটে নেতা শঙ্কুদেব পণ্ডা(Shankudeb Panda)।শহরের চেনা ধর্মনিরপেক্ষ ক্যানভাস সাক্ষী হতে চলেছে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের নির্লজ্জ রাজনীতির।
আরও পড়ুন: খাম-বিভ্রাট: ঋতব্রত শিবির প্রতীক পেতেই প্রতিবাদ ISF-এর, আদালতে যাওয়ার ভাবনা
জানা গিয়েছে অ্যালেন পার্কের দুর্গাপুজোর থিম 'শিব তাণ্ডব' এবং শিব-পার্বতীর বিবাহ। ইতিমধ্যেই সেখানে মহাসমারোহে ভূমিপুজো সম্পন্ন হয়েছে। উদ্যোক্তাদের চমক অবশ্য এখানেই শেষ নয়। মহালয়ার দিন পার্ক স্ট্রিটের বুকে বলিউডি তারকার সমাবেশ এবং অষ্টমীর দিন বারাণসী থেকে উড়ে আসা পুরোহিতদের মন্ত্রোচ্চারণে অঞ্জলি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, বারাণসীর পুরোহিত এনে বাঙালির দুর্গাপুজোয় উত্তর ভারতীয় রীতির এই আধিপত্য বিস্তার কোথাও যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে যে এই ঘটনা বিজেপির সুপরিচিত হিন্দি-হিন্দুত্বের আগ্রাসনেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠতে চলেছে।
পুজো মানে সর্বজনীন এক আনন্দ আর অবশ্যই উপচারের মাধ্যমে দেবতার প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা অর্পণ করা। দুর্গাপুজোর আয়োজন করাতে কোথাও কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু বদলের বঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, হঠাৎ অ্যালেন পার্ককে পুজোর জন্য বেছে নেওয়ার কারণ কী? পার্ক স্ট্রিট চিরকালই বড়দিনের উৎসবের প্রাণকেন্দ্র। শহরের সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সম্প্রদায় থেকে শুরু করে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সমস্ত কলকাতাবাসীর কাছে এটি এক আন্তর্জাতিক মানের ধর্মনিরপেক্ষ উদযাপনের জায়গা। ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের দাবি, সেই অ্যালেন পার্কে দুর্গাপুজোর এই বিশাল আয়োজন নেহাতই কোনো ভক্তি বা আরাধনার তাগিদে নয়। বরং, বড়দিনের মূল কেন্দ্রটিতে হিন্দুত্বের ধ্বজা উড়িয়ে একটি প্রচ্ছন্ন বার্তা দিতে চাইছে বিজেপি। অনেকে মনে করছেন, এটি নিছক কোনও ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং বাংলার বহুত্ববাদী সংস্কৃতি ও সংখ্যালঘুদের উৎসব-পরিসরে আঘাত হানার এক সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ছক।
এর পাশাপাশি প্রকট হয়েছে গেরুয়া শিবিরের অন্তর্দ্বন্দ্বের কাঁটাও। বৌবাজারের সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের পুজোর সঙ্গে শঙ্কুদেবের সাম্প্রতিক বাগযুদ্ধ কারও অজানা নয়। মধ্য কলকাতার ওই হেভিওয়েট পুজোকে টেক্কা দিতেই কি এবার পার্ক স্ট্রিটকে বেছে নিলেন শঙ্কু? সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের ঐতিহ্যকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে অ্যালেন পার্কের এই পুজো আদতে বিজেপির অন্দরের দুই নেতার ইগোর লড়াই বলেও মনে করছেন অনেকে। আর সেই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব মেটাতে এবং রাজনৈতিক পেশিশক্তি প্রদর্শন করতে নির্লজ্জভাবে ঢাল করা হচ্ছে ধর্মকে। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই, বড়দিনের অ্যালেন পার্কে গেরুয়া আগ্রাসন শেষ পর্যন্ত উৎসবের আনন্দ ছড়াবে, নাকি বিভেদের বিষবাষ্প— সেই প্রশ্ন উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।














