যাদবপুরের মাননীয় বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়। আপনাকে যত দেখছি, তত অবাক হচ্ছি। শুধু অবাক হচ্ছি তাই নয়, আপনার সাহস ক্রমশ দু:সাহসে পরিণত হচ্ছে দেখে অনেকেই বিচলিত হচ্ছেন। হওয়ারই কথা। আপনি বিধায়ক না হলে আপনাকে এতটা গুরুত্ব কেউ দিত না। কিন্তু বিধানসভার নির্বাচিত বিধায়ক বলেই আশঙ্কাটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।
যাদবপুরে আপনি যা করলেন, সে নিয়ে এতটুকু অনুশোচনা নেই। আপনি কিছু গুন্ডাবাহিনী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে একটা তছনছ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যের এমব্লেমের উপর পা চাপিয়ে উঠেছে আপনারা সাকরেদরা। ভেঙেছেন। একবারের জন্য দু:খপ্রকাশ নেই। আপনার দলের রাজ্য সভাপতি বলছেন, এবিভিপি সংগঠন বিজেপির কেউ নয়। তাহলে তাদের নিয়ে ৪ নম্বর গেট দিয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামা করে ঢুকলেন কেন? হ্যাঁ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া বলুন বা ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা বলুন, তারা আপনার সাগরেদদের ঘা কতক দিয়েছে। তো ভেবেছিলেন কি, ঢুকবেন আর তারা দরজায় খিল দিয়ে লুডো খেলবে?
এসব আপনি কেন করছেন, সকলে বুঝতে পারছে। দেশের অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠানটিকে আপনারা রাজনৈতিকভাবে কব্জা করতে পারছেন না। যেমন পারেননি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়কে। তাই একটা ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করে কব্জা করে নাও। যেভাবে আপনার দল বা সরকার ২৪৭টি কলেজে বিজেপির সাংসদ-বিধায়কদের বসিয়ে কলেজগুলিকে রাজনীতিমুক্ত করতে সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে! অনেক চেষ্টা করেও তথাকথিত ডানপন্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে দাঁত ফোটাতে পারেনি। আপনি ভেবেছিলেন দেখিয়ে দেব। কিন্তু ব্যাপারটা বুমেরাং হয়ে গিয়েছে। রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তও ঘুরিয়ে আপনাদের হল্লাবাজির বিরোধিতা করেছেন। যে কোনও সুস্থ মানুষ সেটাই করবেন।
আপনি যখন বুঝতে পারলেন লক্ষ্যে ব্যর্থ হয়েছেন, তখন আপনার দলের চিরপরিচিত ওই দুটো অভিযোগ তুলে দিলেন। যেটা দেশের প্রধানমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়োজন মতো হামেশাই ব্যবহার করে থাকেন। আপনি বললেন, এরা দেশবিরোধী। মানে যারা ছাত্র সংসদে রয়েছে তারা। বৃহৎ অর্থে সকলেই। কারণ প্রত্যেকেই ছাত্র সংসদের সদস্য। আপনাকে প্রশ্ন, এরা দেশবিরোধী কোনও কার্যকলাপ করেছে, এমন একটা উদাহরণ তো দিন। যদি আপনাদের কাছে তার হাতে গরম প্রমাণ থাকে, তাহলে অপেক্ষা করছেন কেন? আপনার সরকারের অস্ত্র ইউএপিএ দিয়ে তাদের গ্রেফতার করেননি কেন? না করলে এখনই করুন। পুলিশ-প্রশাসন তো আপনাদের। রাজ্য আপনাদের, দেশও।
আরও একটি অভিযোগ তুলেছেন। এই পড়ুয়াদের টুকরে টুকরে গ্যাং বলেছেন। এই টুকরে টুকরে গ্যাংটা কি যদি বুঝিয়ে বলেন। কেন্দ্রে বিজেপি আসার পর থেকেই এই শব্দটা শুনছি আমরা। এরা কারা? কী এদের বৈশিষ্ট্য? এরা খায় কি? এরা পরে কি? এরা দেশকে টুকরো টুকরো করতে কী করেছে, তা যদি একটু গুছিয়ে বলেন। এরা নিশ্চিতভাবে ভয়াবহ কোনও ভিন গ্রহের জীব। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে দেশের অখণ্ডতা ও নিরাপত্তাকে প্রশ্ন চিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে!
এবং আপনি বলছেন, লালসন্ত্রাস সহ্য করব না। দেখুন, এটা একটা বহু ক্লিশে হয়ে যাওয়া কথা। প্রায় শূন্যে নেমে আসা বামেরা যদি আপনাদের রাজত্বেও লাল সন্ত্রাস চালাতে সক্ষম হয়, তাহলে বুঝতে হবে, ওরা কিন্তু বাড়ছে। আর যদি ওরা বাড়ে তাহলে তা আপনাদের জনবিরোধী কাজের জন্যই বাড়ছে। বরং আপনি আপনার অতীতের দিকে একটু ফিরে তাকান। যাদের আজ সন্ত্রাসী বলছেন, সেই রাজনীতিই আপনি পারিবারিকভাবে করে বড় হয়েছেন। তাদের স্লোগানকেই বছর ৩৫ আগে বড্ড মিষ্টি লাগত। তাদের দেশবিরোধী বলতে গিয়ে একবারও হোঁচট খাচ্ছেন না মাননীয় বিধায়ক!
আপনি মারাত্মক কয়েকটি অভিযোগ করেছেন। এই অভিযোগগুলি আসলে গোটা যাদবপুরের পড়ুয়াদের কাঠগড়ায় তুলে দেওয়া। এক, এরা অন্তর্বাস পরে মিছিল করে। দুই, পড়ুয়ারা কন্ডোম ঝুলিয়ে সাজায়। তিন, স্যানিটারি ন্যাপকিনে লাল রঙ করে বিশ্ববিদ্যালয় টাঙিয়ে দেয়। চার, গণচুম্বন করে প্রতিবাদ জানায়। পাঁচ, এরা নেশা করে... ইত্যাদি। দেখুন শর্বরী, এটা সকলেই মানি এবং জানি, যাদবপুরে নেশার অভিযোগ আছে, এবং চলেও। এমনকি হস্টেলে র্যাগিং, বহিরাগতদের থাকা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। দুর্ঘটনা ঘটেছে, অকাল মৃত্যু হয়েছে। এটা ঠিক। এই জায়গায় কর্তৃপক্ষের রাশ টানা উচিত। কড়া হওয়া উচিত। বন্ধ করতে হবে। কিন্তু কে, কোথায়, কবে স্যানিটারি ন্যাপকিন বা কন্ডোম দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় সাজিয়েছেন যদি একটু ছবি তুলে দেখান। গনচুম্বন কবে, কোথায়, কেন হয়েছিল যদি একটু মনে করিয়ে দেন। অভিযোগ করলে প্রমাণ হাতে নিয়ে করছেন, এটা তো ভাবতেই হবে। কারণ, আপনি তো বিধায়ক। আপনার দায়িত্ব অন্যদের চেয়ে বেশি।
একেবারে শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের গরিমা নিয়ে আপনি প্রশ্ন তুলেছেন। আপনারা ক্ষমতায় থাকুন বা নাই থাকুন, যাদবপুরের গরিমা আপনাদের দয়ার জন্য অপেক্ষা করে না। রাজ্যের ও দেশের সেরা পড়ুয়ারা এখানে পড়ে। রেজাল্টও তাই চোখ ধাঁধানো। অনেকটা রামকৃষ্ণ মিশনের মতো। দেশে রেকর্ড তৈরি করে এখানকার পড়ুয়া বছরে ৪ কোটির চাকরিও পায়।
আর গরিমা? আপনি বোধহয় জানেন না। বিজেপির ফাটা রেকর্ড বাজানোর আগে জেনে নিন।
এক, জাতীয় প্রাতিষ্ঠানিক র্যাঙ্কিং ফ্রেমওয়ার্ক (NIRF) অনুযায়ী ভারতের রাজ্যগুলির বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে প্রথম এবং সামগ্রিকভাবে দেশের সেরা যাদবপুর।
















