মুসাফির ক্যাফে' : কফির উষ্ণতার সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া মিষ্টি প্রেমের গল্প
প্রেমের গল্প তো প্রেমের গল্পই হয়। তার চেয়ে আলাদা কিছু হয় কী? পরিচালক রুচির অরুণ-এর ওয়েব সিরিজ 'মুসাফির ক্যাফে' সেই হারিয়ে যাওয়া প্রেমের মিষ্টি উদযাপন।
Sponsored

প্রেমের গল্প তো প্রেমের গল্পই হয়। তার চেয়ে আলাদা কিছু হয় কী? পরিচালক রুচির অরুণ-এর ওয়েব সিরিজ 'মুসাফির ক্যাফে' সেই হারিয়ে যাওয়া প্রেমের মিষ্টি উদযাপন। সিরিজটি সদ্য মুক্তি পেয়েছে নেটফ্লিক্সে। স্ট্রিমিং শুরুর পর থেকেই বেশ সাড়া ফেলেছে। অনেক গোপন মনের শিকলে পড়েছে টান। কী এমন রয়েছে এই সিরিজে।
আচ্ছা এ-যুগের প্রেম কি কমিটমেন্টের ধার ধারে? মান্ধাতার আমলে হয়তো ধার ধারত। মা-বাবার কথায় একেবারে ছাদনাতলায় শুভদৃষ্টির সময় বর-কনে প্রথমবার একে অপরকে দেখত এবং সারাজীবন একছাদের তলায় দুজনে থেকে যেত। 'হ্যাপিলি ম্যারেড এভার আফটার'। কিন্তু আজ? দুটো মানুষ পরস্পরের সঙ্গে কমফোর্টেবল, সম্পর্কে আছে বলেই পরিণতি বিয়ে এমন ধ্যানধারণায় কি বিশ্বাসী জেন জি-রা? সম্পর্কের একমাত্র পরিণতি বিয়েই? আর বিয়ে পর্যন্ত না গড়ালে বিচ্ছেদ? কোনটা আসল ভালবাসা না বিয়ে? কাউকে ভালবাসলে তাঁর বন্ধু হয়ে, সঙ্গী হয়ে কী সারাজীবন একসঙ্গে চলা যায় না? যদি এমনটাই হত তা হলে 'মুসাফির ক্যাফে'র চন্দর আর সুধার প্রেমটা অমর হয়ে যেত। আসলে আমাদের দেশ বলেই হয়ত আজও অ্যারেঞ্জ ম্যারেজের সেলিব্রেশন হয়। যুগ যতই আধুনিক হোক আমাদের সমাজ ব্যবস্থা, বেশিরভাগ মা-বাবা,পরিবার আজও লিভ ইন সম্পর্ক, লং ডিস্টেন্স সম্পর্ক বা লং ডিস্টেন্স ম্যারেজে বিশ্বাসী নয়। শুধুমাত্র সেই কারণেই সমাজকে তুচ্ছ করে নামগোত্রহীন ভালবাসা বহন করে নিজের মন ভরাতে পারেনি চন্দর। ভালবেসে ছাড়তে চেয়েছিল নিজের স্বপ্নও। আর সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল তাঁর একান্ত নিজের স্বপ্নের পিছনে হাঁটা। তৈরি করতে পারল 'মুসাফির ক্যাফে'র মতো এক-একটা হারানো প্রেমের স্মৃতিসৌধ। যে ক্যাফের প্রবেশ পথে জ্বলজ্বল করে চন্দরের প্রাক্তনের হাতে লেখা 'মুসাফির' নামটা। এমন স্বপ্নপূরণ তো সে আগেই করতে পারত। সিরিজটা দেখতে বসে বারবার এই উপলব্ধিটাই হয়।
এক সুন্দর স্বপ্ন 'মুসাফির ক্যাফে'র জন্ম হল ব্যর্থ প্রেমের জঠর থেকে। এই ব্যর্থতা ভালবেসে উদার হতে না পারার। সমাজের ভিড়ে মিশে গিয়ে অন্যের চোখ দিয়ে নিজের সম্পর্ককে যাচাই করার। তা না হলে হয়ত চন্দর আর সুধা দেশের দু-প্রান্তে থেকেও আজীবন একই থেকে যেত। চন্দরের ছাপোষা মধ্যবিত্ত মানসিকতাই এখানে দায়ী। পছন্দের নারীকে বিয়ের আগে নিজের ফ্ল্যাটে এনে রাখতে পারল, রাত্রি যাপন করতে পারল, এক বিছানা ভাগ করতে পারল কিন্তু সম্পর্কটাকে সেই বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানের প্রশ্নে এসে জলাঞ্জলিই দিতে হল তাকে। সত্যি কি চন্দরের মা ততটা পুরনোপন্থী মানুষ ছিলেন? বা সুধার মা-ও? ছিলেন না।
অন্যদিকে শৈশব থেকে মাকে হিউমিলিয়েট হতে দেখা পিতৃহারা সুধা চেয়েছিল মায়ের এবং নিজের অধরা স্বপ্নগুলো পূরণ করতে। আবার একইসঙ্গে চেয়েছিল চন্দরের মতো বন্ধুকেও যার তারই মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকবে কিছু করে দেখানোর। ওই বিয়ে সংসার বাচ্চার বৃত্তে সে ঘুরবে না। কিন্তু সে আদৌ বোঝেনি ঠিক কী চায়। বোঝেনি চন্দরকেও। পথ বদল হতেই পারে তার সঙ্গে স্বপ্নপূরণের কোনও সম্পর্ক নেই এটা ছিল তাঁর বোধের ঊর্ধ্বে। সুধার উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানসিকতা ভালই, মায়ের প্রতি দায়িত্বের মনোভাবনাও সুন্দর কিন্তু সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার হাড়িকাঠে জোর করে অন্য কারও মাথা ঢুকিয়ে দেওয়াটা অন্যায়। ফলে চন্দরের পরিণতি যা হবার তাই হল। চন্দরের প্রেমপর্ব শেষ তো হলই কমিটমেন্ট ফোবিয়া, কনফিউশন, নিজেকে বুঝতে না পারার খেসারত দিল সুধাও। যা-ই হোক সুধার প্রেমে ব্যর্থ চন্দর ‘মুসাফির ক্যাফে’ খুলে ফেলল বন্ধু প্রীতির সাহায্যে। এখন প্রশ্ন হল সুধার সঙ্গে বিয়ে, সংসার এবং বাচ্চা এমন একটা পিকচার পারফেক্ট জীবন যদি চন্দর পেত তা হলে কি আদৌ ‘মুসাফির ক্যাফে’র জন্ম হত? আসলে একটা কিছু শেষের পরেই বোধহয় নতুনের সৃষ্টি হয়। যেমন সব হারিয়ে চন্দর ফিরে পেল নিজের স্বপ্নকে। অতীত হয়ে যাওয়া সুধা রয়ে গেল তার মনের সঙ্গোপনে। মাঝখান থেকে একেবারেই কনফিউশন ছিল না যে মেয়েটির সেই প্রীতি এমন একজন মানুষের স্বপ্নের সঙ্গে নিজের স্বপ্নকে মিলিয়ে দিল যার অস্তিত্ব আরেকজনের কাছে বাঁধা পড়ে আছে। আসলে এই সিরিজটা প্রেমের বাইরে গিয়ে নিজেকে আবিষ্কার করার? পুরোটা জানতে সিরিজটা অবশ্যই দেখতে হবে।
‘মুসাফির ক্যাফে’ এক অন্যরকম প্রেমের ল্যান্ডস্কেপ। সিরিজের একটা পার্টে ভোপাল শহর অন্য পার্টে মুসৌরি। অতীত বর্তমানে অন অফ খুব মুনশিয়ানার সঙ্গে সিরিজে দেখিয়েছেন পরিচালক রুচির অরুণ। চন্দর আর সুধার প্রেমপর্ব, পাগলামি সবটাই যেন একটা কবিতার মতো। তবে সবচেয়ে সুন্দর হল পাহাড়ের কোলে স্বপ্নের মতো সাজানো ছোট্ট মুসৌরি, সবুজের ঢাল, রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশ, পেঁজা তুলোর মতো পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মেঘ আর ছবির মতো একটা ক্যাফেটেরিয়া। এমন একটা জায়গা থাকার বা ক্যাফে খোলার স্বপ্ন বোধহয় অনেকেই দেখেন মনে মনে। ক'জনেরই বা সেই স্বপ্ন পূরণ হয়। ক'জনই এমন বন্ধুই পেয়ে যায় জীবনে। দুই নারী আর একজন পুরুষের মধ্যে সেতুবন্ধন মুসৌরি। যেখানে এসে মেলে তিনটে মুখ।
এমন একটা ওয়েব সিরিজ দেখলে মন একটু তোলপাড় হবেই। দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন বিক্রান্ত ম্যাসে। তার অভিনয় নিয়ে বলার কিছুই নেই। ‘সেক্টর ৩৬’, ‘ফরেনসিক’, ‘প্রীতম অ্যান্ড পেদ্রো’ বা ‘মুসাফির ক্যাফে’ ভার্সিটালিটির চূড়ায় থাকা একজন অভিনেতা। সুধা চরিত্রে ভেদিকা পিন্টো অনবদ্য তুলনায় প্রীতি চরিত্রে মহিমা মাকওয়ানা একটু নিষ্প্রভ। তবে প্রীতির চরিত্রটা ভীষণ বাস্তবসম্মত। এর চেয়ে বেশি এক্সপ্রেশন ওই চরিত্রে যেত না। আদিল হুসেন এবং সাদিয়া সিদ্দিকি খুব সাবলীল অভিনয় করেছেন। এছাড়া খুব ভাল অভিনয় করেছেন বাকিরাও।
লেখক দিব্যা প্রকাশ দুবের ‘মুসাফির ক্যাফে’ বইটি অবলম্বনে এই ওয়েব সিরিজটি তৈরি হয়েছে। সেরা একটি চিত্রনাট্য লিখেছেন শরণ্যা রাজগোপাল। ক্রিয়েশনেও তিনিই রয়েছেন। প্রযোজনায় টেরিবলই টিনি টেল প্রোডাকশন।
Sponsored

Sponsored

Sponsored

Sponsored













