কুণাল ঘোষ
একটি সফল নাটক থেকে সফল চলচ্চিত্র। কাজ কঠিন। নজির কম। এর মধ্যেই ইতিবাচক ছাপ রেখেছে 'উইঙ্কল টুইঙ্কল'। ব্রাত্য বসুর (Bratya Basu) ২০০২ সালের নাটক এই ২০২৬-এ সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের (Srijit Mukherjee) ছবি। এখনও না দেখে থাকলে, চটপট দেখে ফেলাই ভালো। একটি ভালো বাংলা ছবি, যা মস্তিষ্কের ধূসর অংশে স্মৃতিপ্ররোচিত অণুরণন ঘটায়।
নাটক দেখেছিলাম। হয়ত তখন বাংলায় বামজমানা বলে ঝাঁঝটা আরও তীব্র লেগেছিল। আজ বামদুর্গ নেই, এখন শূন্য থেকে ফেরার লড়াই। তৃণমূল (TMC) জমানাতেও দাঁড়ি। বিজেপির (BJP) ডবল ইঞ্জিন জমানা। সৃজিত কিন্তু এই 'উইঙ্কল টুইঙ্কল'-এর (Winkle Twinkle) কামড়টা ধরে রাখতে পেরেছেন। সময়ের চালচিত্রে কোথাও একটা সমকালীন হয়ে উঠেছে তাঁর ছবি। মূল নাট্যকার ব্রাত্য বসুকেও প্রশংসা করতে হচ্ছে। ২৪ বছর, মানে দু'যুগ পর বিষয়ের প্রাসঙ্গিকতা ধরে রেখে পর্দায় দর্শককে সম্মোহিত করে রাখা, বড় কম কথা নয়।

জরুরি অবস্থার সময় নিখোঁজ এক কমরেড হঠাৎ ফিরে এলেন ভরা বামজমানায়। কী ভেবেছিলেন, আর কী দেখছেন। সময় কত পাল্টেছে, একই বিপ্লবের পথিকদের কতজনের জীবনে কত মেদ জমেছে। বিপ্লবী পার্টি শাসক হয়ে উঠলে কেমন হয়। রাজনীতি, সম্পর্ক, প্রেম, পিতাপুত্র সমীকরণের নাটকীয়তা সৃজিত ধরেছেন দারুণ। যাঁরা পাল্টে গেলেন আর যাঁরা পাল্টালেন না, সংঘাতের প্রতিফলন চমৎকার। কেউ যেন এগিয়ে চলছেন, আর কেউ দাঁড়িয়ে আছেন কোনো অপেক্ষায়।

 

২০০২ তে মঞ্চের নাটক থেকে ২০২৬-এর ছবি একটি ভাবনায় দর্শকের অভিজ্ঞতাকে হয়ত অনুমান মেলাতে সহযোগিতা করে। যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ। যে দলই আসুক ক্ষমতায়, তার দুটো শ্রেণী। একটি আদর্শ নিয়ে অপরিবর্তিত স্বপ্ন দেখে, অন্যটি পরিবর্তনশীল আপোষে মানিয়ে নেওয়ার নামে মেদযুক্ত ভারে দুষ্ট ও পুষ্ট হয়। সময়ের সঙ্গে পাল্টে যায় প্রজন্মের দৃষ্টিকোণ। যে খুঁজছে তার পুরনো দিন আর বিশ্বাস, তার জন্য অবিরাম হোঁচট।

ব্রাত্য ছিলেন ভিত্তি, সৃজিত যেন ভবিষ্যত। ২৪ বছর পরেও মন ভরে গেল। কৃতিত্ব সৃজিতের। পাশাপাশি বলতে হয় অভিনেতাদের কথা। মূল চরিত্র সব্যসাচী সেন। সেদিনের দেবশঙ্কর হালদার (Debsankar Halder), আজকের ঋত্বিক চক্রবর্তী (Ritwik Chakraborty)। আমি মঞ্চে দেবশঙ্করের ভক্ত। কিন্তু পর্দায় ঋত্বিককে যত দেখি, অবাক হই। অপূর্ব অভিনয়। যতদিন পর্দায়, ততক্ষণ দর্শককে টেনে রাখার ক্ষমতা। তাঁর পুত্রের ভূমিকায় পরমব্রত যথাযথ। অসমান্য অভিনয় অনসূয়া দেবীর; এবং সৃজিতের দুরন্ত প্রয়োগ সোহিনীকে তাঁর তরুণী বয়সের উপস্থিতিতে। ঋত্বিক এবং অনসূয়ার বিচিত্র রসায়নটি দুই শিল্পী এতটা বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন, এই সম্পর্কের মায়াজাল দেখতে ছবিটা একাধিকবার দেখা যেতেই পারে। এখানে নকশাল আন্দোলন বা সিপিএম সরকার; আদর্শের বিভ্রান্ত একরকম। আর মানুষগুলোর গল্প আলাদাভাবে মুগ্ধ হয়ে দেখার মত। ক্যামেরা, আলো, শব্দ ঠিকঠাক। গান এবং গানের চিত্রায়ণ দারুণ। সৃজিত ব্রাত্যর নাটককে ফিরিয়ে এনে শুধু দর্শককে একটি ভালো সিনেমা দেখাননি; তিনি ভাবিয়েছেন, ভাবনার রেশ থেকে যাওয়ার আয়োজন করেছেন। বাংলা ছবির দর্শকের হলে গিয়ে দেখা দরকার 'উইঙ্কল টুইঙ্কল।'