বাঙালির দুর্গাপুজোর আবেগ, নস্টালজিয়া আর ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে আকাশবাণীর কালজয়ী সৃষ্টি ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। প্রতি বছর মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ এবং পঙ্কজকুমার মল্লিকের সুরারোপিত গান না শুনলে বাঙালির পুজো শুরুই হয় না। কিন্তু এই কালজয়ী অনুষ্ঠানের ইতিহাসের নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক চরম অভিমান, ক্ষোভ এবং প্রতিবাদের গল্প। ১৯৪১ সালের মহালয়ার ভোরে এক অনভিপ্রেত ঘটনার জেরে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ অনুষ্ঠান চিরতরে বয়কট করেছিলেন তৎকালীন জনপ্রিয় গায়িকা শৈল দেবী।

আরও পড়ুন: রাজ্যে এবার ট্রিপল ইঞ্জিন! পুরভোটের টার্গেট বাঁধলেন শুভেন্দু

১৯৩১ সাল থেকে শুরু হওয়া এই লাইভ অনুষ্ঠানে তখন ‘বাজলো তোমার আলোর বেণু’ গানটি গাইতেন শিল্পী শৈল দেবী। ১৯৪১ সালের মহালয়ার ভোরে যখন স্টুডিওতে লাইভ সম্প্রচারের সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন, ঠিক গান গাইবার আগের মুহূর্তে সংগীত পরিচালক পঙ্কজকুমার মল্লিক শৈল দেবীকে একটি চরম আপত্তিকর ও ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে বসেন। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, “তুমি শুদ্ধ আছো তো?”

লাইভ রেকর্ডিংয়ের ঠিক আগের মুহূর্তে সবার সামনে একজন মহিলা শিল্পীর শারীরিক শুচিতা নিয়ে এমন প্রকাশ্য প্রশ্নকে অত্যন্ত অপমানজনক ও বেআব্রু মনে করেছিলেন শৈল দেবী। তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়লেও, লাইভ ব্রডকাস্টের সমস্ত আয়োজন সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় সে যাত্রায় তিনি গানটি গেয়ে দেন। কিন্তু অবমাননার সেই ক্ষত তিনি ভুলে যাননি।

আরও পড়ুন: মাতৃত্বের জয়গান ও নারীশক্তির বন্দনা: “আমার মা আমার দুর্গা”-র মঞ্চে চাঁদের হাট!

মহালয়ার সেই অনুষ্ঠান শেষ হতেই নিজের আত্মসম্মান রক্ষার্থে সরব হন তরুণী শৈল দেবী। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, পঙ্কজকুমার মল্লিকের সংগীত পরিচালনায় তিনি আর কোনওদিন কোনো গান গাইবেন না। রেডিও কর্তৃপক্ষকে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে ১৯৪২ সাল থেকে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ থেকে নিজেকে চিরতরে সরিয়ে নেন তিনি। তৎকালীন সময়ে দাঁড়িয়ে পঙ্কজ মল্লিকের মতো এক মহীরুহের বিরুদ্ধে একজন তরুণী সংগীতশিল্পীর এমন দৃঢ় প্রতিবাদ চমকে দিয়েছিল সবাইকে।

শৈল দেবীর বিদায়ের পর ১৯৪২ ও ১৯৪৩ সালে ‘বাজলো তোমার আলোর বেণু’ গানটি গেয়েছিলেন সাবিত্রী দেবী। এর কিছুদিন পর, রেডিও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতান্তরের জেরে সংগীত পরিচালকের পদ থেকে সাময়িকভাবে সরে দাঁড়ান পঙ্কজকুমার মল্লিক নিজেও। সেই সংকটকালীন মুহূর্তে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের অনুরোধে মাত্র ২৩-২৪ বছর বয়সী তরুণ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কাঁধে এসে পড়ে পুরো অনুষ্ঠান পরিচালনার গুরুদায়িত্ব।

আরও পড়ুন: বচসার জেরে স্ত্রীকে এলোপাথাড়ি কোপ, কাঁকসায় গ্রেফতার স্বামী

দায়িত্ব নিয়েই হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র দুটি গানে বড়সড় পরিবর্তন আনেন। ‘বাজলো তোমার আলোর বেণু’ গানের মূল সুরটি অনেকটাই বদলে দেন হেমন্ত। বর্তমান প্রজন্মে আমরা যে সুরে গানটি শুনি, তা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়েরই তৈরি। একই সঙ্গে সাবিত্রী দেবীর পরিবর্তে এই গানটি গাওয়ানোর জন্য তিনি নিয়ে আসেন শিল্পী সুপ্রীতি ঘোষকে। বাণীকুমারের লেখা আদি গান ‘এসো তুমি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী’র কথা ও সুর সামান্য পরিবর্তন করে হেমন্ত ও বাণীকুমার মিলে তৈরি করেন ‘জাগো দুর্গা জাগো দশপ্রহরণধারিণী’।

আরও পড়ুন: ঢেলে সাজবে পুলিশবাহিনী, হবে বিপুল নিয়োগ: সময়সীমা ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর

পরবর্তীকালে রেডিও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মান-অভিমান মিটিয়ে পঙ্কজকুমার মল্লিক যখন পুনরায় অনুষ্ঠানে ফিরে আসেন, তখন তিনি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের করা এই সুর ও কথার পরিবর্তনকে সানন্দে স্বীকৃতি ও অনুমোদন দিয়েছিলেন।

বাঙালির প্রাণের এই মহালয়ার পেছনে সুরের যেমন মায়াজাল রয়েছে, ঠিক তেমনই জড়িয়ে রয়েছে শৈল দেবীর মতো এক প্রতিভাময়ী শিল্পীর আত্মমর্যাদা রক্ষার এক অসামান্য লড়াইয়ের ইতিহাস।