পর্দায় তাঁর ক্ষুরধার অভিনয়, সংলাপ বলার অনন্য ভঙ্গি আর বাস্তব জীবনের খামখেয়ালি ব্যক্তিত্ব তাঁকে আর পাঁচটা বলিউড তারকার থেকে আলাদা করেছিল। তিনি বলিউডের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা নানা পাটেকর। সম্প্রতি ৭৫ বছর বয়সে তাঁর প্রয়াণের পর, আবারও বিনোদন দুনিয়ায় ফিরে এসেছে নব্বইয়ের দশকের এক চর্চিত অথচ অসমাপ্ত প্রেমকাহিনি— নানা পাটেকর ও মনীষা কৈরালার সম্পর্ক।

আরও পড়ুন: “সাহস থাকলে প্রমাণ দেখান!” রেখার সঙ্গে লিভ-ইন সম্পর্কের গুজবে চরম ক্ষুব্ধ অমিতাভ

নানা পাটেকর এবং মনীষা কৈরালার সম্পর্কের শুরুটা হয়েছিল ১৯৯৬ সালে ‘অগ্নি সাক্ষী’ সিনেমার সেট থেকে। সেই ছবিতে নানা পাটেকর মনীষার মানসিক ভারসাম্যহীন স্বামীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। কিন্তু সেই বছরই মুক্তি পাওয়া সঞ্জয় লীলা বনসালির মিউজিক্যাল ড্রামা ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’-এ সম্পর্কের সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে যায়। এই ছবিতে মনীষা কৈরালার অভিনীত চরিত্র ‘অ্যানি’-র বোবা-কালা বাবা অর্থাৎ জোসেফের ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল নানাকে। রুপোলি পর্দায় বাবা-মেয়ের এই রসায়ন দর্শকমনে দাগ কাটলেও, বাস্তব জীবনে তাঁদের মধ্যে গড়ে উঠেছিল এক গভীর প্রেমের সম্পর্ক।

আরও পড়ুন: দিঘায় পুজোর আনন্দ দ্বিগুণ! শান-অন্বেষার গানে জমবে সৈকত শহর

মনীষার সঙ্গে যখন নানার সম্পর্ক তৈরি হয়, তখন অভিনেতার বয়স ৪৫ পার এবং মনীষা ছিলেন মাত্র ২৬ বছরের তরুণী। সেই সময় বিবেক মুসরানের সঙ্গে ব্রেকআপের পর মনীষা মানসিকভাবে কিছুটা ভেঙে পড়েছিলেন। নানার পরিপক্ব ব্যক্তিত্ব ও সৃষ্টিশীলতা তাঁর জীবনে এক নতুন আশ্রয় নিয়ে আসে। তবে এই সম্পর্কের পেছনে একটি বড় জটিলতা ছিল। নানা পাটেকর তখন বিবাহিত ছিলেন এবং স্ত্রী নীলাকান্তি পাটেকরের সঙ্গে আলাদা থাকলেও তাঁদের আইনত বিচ্ছেদ হয়নি। নানার পক্ষে নীলাকান্তিকে ডিভোর্স দেওয়া সম্ভব ছিল না, যা মনীষার ভবিষ্যৎকে এক অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।

আরও পড়ুন: ঠাকুমার মৃত্যু নিয়ে দিল্লি পুলিশের মিথ্যাচার! গর্জে উঠল অভিজিতের পরিবার

শোনা যায়, নানা পাটেকরের প্রচণ্ড অধিকারবোধ এবং মনীষার পোশাক ও পেশাগত জীবন নিয়ে অতিরিক্ত খবরদারি ধীরে ধীরে সম্পর্কে তিক্ততা ডেকে আনে। তবে তাঁদের সম্পর্কের কফিনে শেষ পেরেকটি পোঁতা হয় তখন, যখন মনীষা অভিনেত্রী আয়েশা জুলকার সঙ্গে নানার ঘনিষ্ঠতা ধরে ফেলেন। চরম অবিশ্বাস ও অভিমান নিয়ে মনীষা এই সম্পর্ক থেকে চিরতরে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন। ‘যুগ পুরুষ’ সিনেমার শুটিং চলাকালীনই তাঁদের এই প্রেমের অধ্যায়ে ইতি পড়ে।

আরও পড়ুন: ফাঁসির আগে কারাগার থেকে ফোনে বিয়ে! ইরানি বিক্ষোভকারী আলিরেজার করুণ বিদায়

বিচ্ছেদের পর মনীষা নিজেকে সামলাতে মদ্যপানের অন্ধকারে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন, যার উল্লেখ পরবর্তীকালে তিনি নিজের স্মৃতিকথা ‘হিলড’ (Healed)-এ উল্লেখ করেছিলেন। মনীষার এই অবস্থা দেখে সহ্য করতে পারেননি নানা পাটেকরও। ১৯৯৭ সালে দেওয়া এক আবেগঘন সাক্ষাৎকারে নিজের মানসিক যন্ত্রণার কথা বলতে গিয়ে প্রায় কেঁদে ফেলেছিলেন অভিনেতা।

নানা বলেছিলেন, “আমি কী কষ্টের মধ্য দিয়ে গেছি, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। দয়া করে এই নিয়ে আর কথা বলবেন না। আমি মনীষাকে ভীষণ মিস করি।” মনীষার প্রতিভার প্রশংসা করে তিনি আরও বলেছিলেন, “ও অত্যন্ত সংবেদনশীল একজন অভিনেত্রী।” মনীষার মদ্যপান প্রসঙ্গে অভিনেতা বলেন, “ও নিজের সঙ্গে যা করছে, তা দেখে আমি চোখের জল ধরে রাখতে পারছি না। হয়তো আজ ওর বিষয়ে কিছু বলার অধিকার আমার আর নেই।”

আরও পড়ুন: আইটি-র চাকরি ছেড়ে রাজনীতি, সিজেপিতে অজিঙ্কের উত্থান কীভাবে!

গত ৮ অক্টোবর নানা পাটেকরের আকস্মিক প্রয়াণের পর, পুরনো সব তিক্ততা ভুলে মনীষা কৈরালা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রয়াত অভিনেতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। নানাকে অভিনয় শিল্পের এক অনন্য ‘স্তম্ভ’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি লেখেন, “সিনেমা জগতে তাঁর অবদান এবং কাজের প্রতি নিষ্ঠা চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”

বাস্তব জীবনের এই বিচ্ছেদ নানা পাটেকরকে আজীবন তাড়িয়ে বেড়ালেও, তাঁদের এই অসম্পূর্ণ প্রেমকাহিনি আজও বলিউডের ইতিহাসের পাতায় এক ট্রাজিক অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে।