ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২৫ বছর বয়সী তরুণ আলিরেজা সেপাহিকে (Alireza Sepahi) ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। তবে মৃত্যুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, জীবনের শেষ মুহূর্তে এক হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী থাকল বিশ্ব। কারাবন্দি প্রেমিকা ২২ বছর বয়সী মাশাদ কেশানির (Mahshad Keshani) সঙ্গে কারাগার থেকেই ফোন কলের মাধ্যমে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন আলিরেজা। বিয়ের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই, ৫ অক্টোবর সোমবার সকালে ইসফাহানের কারাগারে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

আরও পড়ুন: কলকাতা পুরসভার পুজো বিজ্ঞাপনে বাংলা-হিন্দির জগাখিচুড়ি, তীব্র নিন্দা কুণালের

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলিরেজা সেপাহি এবং মাশাদ কেশানি দুজনেই চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের সরকারবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ইসফাহানের পৃথক দুটি কারাগারে বন্দি ছিলেন। আলিরেজা ছিলেন ‘দস্তগের্দ’ (Dastgerd) কারাগারে এবং মাশাদকে রাখা হয়েছিল ‘দওলাতাবাদ’ (Dowlatabad) নারী কারাগারে।

আলিরেজার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নিশ্চিত জেনে মাশাদ নিজেই এই বিয়ের প্রস্তাব দেন। তেহরানের মানবাধিকার আইনজীবী আমিরসালার দাভুদির (Amirsalar Davoudi) সহায়তায় আইনি নিয়ম মেনে ফোনে এই অডিও সংযোগ স্থাপন করা হয়। ৯ মিনিটের এই সংক্ষিপ্ত ও আবেগঘন বিয়েতে দুই বন্দির বাবারাও ফোনে যুক্ত ছিলেন। ইরানি সংস্কৃতি ও ধর্মীয় রীতি মেনে মাশাদের পরিবার যৌতুক বা ‘মোহরানা’ হিসেবে একটি পবিত্র কুরআন শরিফ, জাফরানি মিছরি (Saffron rock candy) এবং একটি লাল গোলাপ দেয়। আইনজীবী যখন বিয়ের মন্ত্র পড়ছিলেন, তখন উপস্থিত কারারক্ষীদের চোখও নাকি জলে ভিজে উঠেছিল।

আরও পড়ুন: বিলবোর্ড-কাণ্ডে ফের অভিষেকের বাড়িতে পুলিশ! শেক্সপিয়র সরণি থানায় তলব

চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি ইসফাহানের আলিখানি স্কয়ারে বিক্ষোভ চলাকালীন চারজন নিরাপত্তা কর্মী নিহতের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আলিরেজাসহ একদল তরুণের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে ইরান সরকার। আইনজীবী দাভুদির মতে, আদালতে কোনও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই রেভল্যুশনারি গার্ডের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে আলিরেজাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলির অভিযোগ, আলিরেজার ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছিল এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনও সুযোগ দেওয়া হয়নি।

আরও পড়ুন: স্বাস্থ্যসচিবকে সরানো হয়নি কেন, অভয়া-কাণ্ডে মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকায় ক্ষুব্ধ অনিকেত

এর আগে, জুলাই মাসে আলিরেজাকে একবার ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু ফাঁসির ঠিক আগের মুহূর্তে তিনি হৃদরোগে (Heart attack) আক্রান্ত হওয়ায় সেবার মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। সুস্থ হওয়ার পর পুনরায় তাঁর ফাঁসির আদেশ কার্যকর করার দিন ধার্য করা হয়।

৫ অক্টোবর আলিরেজা সেপাহির ফাঁসি কার্যকরের পর তাঁর মৃতদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। তাঁর নিজ শহর ইসফাহান থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে কাশানে নিয়ে তাঁর মরদেহ দাফন করতে বাধ্য করে প্রশাসন।

আরও পড়ুন: “গ্রেফতার নয়, কিডন্যাপ করা হয়েছিল”: মুক্তির পর বিস্ফোরক ইউটিউবার ধ্রুব!

এদিকে, সদ্য বিবাহিতা বিধবা মাশাদ কেশানি এখনও ‘দওলাতাবাদ’ কারাগারে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে, বিয়ের খবরটি আন্তর্জাতিক স্তরে ছড়িয়ে পড়ার পর জেল কর্তৃপক্ষ মাশাদের ওপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে এবং বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে তাঁর সমস্ত ফোন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন তাঁদের এই বিয়ের বিষয়টি অস্বীকার করার জন্য পরিবারের ওপরও চাপ দিচ্ছে বলে জানা গেছে।

এক রাতের জন্য নববিবাহিত স্বামী হওয়া আলিরেজা আজ পরলোকে, আর মাশাদ চার দেয়ালের আড়ালে বন্দি এক সদ্যবিধবা। এই করুণ ভালোবাসার গল্পটি ইরানের দমনপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক জীবন্ত ও নির্মম দলিল হয়ে রইল।