ইমরান খানকে (Imran Khan) ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র পাকিস্তানে (Pakistan)। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর মুক্তির দাবিতে তাঁর দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (PTI) লং-মার্চকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। আন্দোলনকারীরা যাতে রাজধানী ইসলামাবাদে (Islamabad) পৌঁছতে না পারেন, তার জন্য একাধিক স্তরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে পাক প্রশাসন। সরকারের স্পষ্ট বার্তা, কোনও পরিস্থিতিতেই বিক্ষোভকারীদের রাজধানীতে ঢুকতে দেওয়া হবে না। ইমরানের শারীরিক অবস্থা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত মাসে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হলে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of Pakistan) জেলের বাইরে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশের পরিবর্তে তাঁকে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে ফের জেলে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ। এই সিদ্ধান্তের পিছনে সেনাবাহিনীর চাপ ছিল বলে দাবি রাজনৈতিক মহলের একাংশের।

আরও পড়ুন: "মায়ের আশীর্বাদে সুখ-সমৃদ্ধিতে ভরে উঠুক": দেশবাসীকে মহালয়ার শুভেচ্ছা মোদির

ইসলামাবাদে এখন নিরাপত্তার ছবিটা কার্যত বদলে গিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় নজরদারি, শহরজুড়ে সেনার টহল এবং সম্ভাব্য জমায়েতের উপর কড়া নজরদারি। সব মিলিয়ে রাজধানীকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নিরাপত্তার বলয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, সেনা উপস্থিতির কারণে ইসলামাবাদ ও পাশের রাওয়ালপিন্ডির মধ্যে তফাত বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে। গত মাসে লং-মার্চের ঘোষণা সামনে আসার পর থেকেই রাজধানীর নিরাপত্তার দায়িত্বে সেনাবাহিনীর ভূমিকা বেড়েছে বলে খবর।

আরও পড়ুন: কোথায় নিয়ে যাওয়া হল অভিজিত-সৌরভদের, মুখে কুলুপ প্রশাসনের

তবে আন্দোলনের উত্তাপ সবচেয়ে বেশি খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে। ছ'দিন আগে সেখান থেকে ইসলামাবাদের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলেও প্রশাসনের বাধায় এগোতে পারেননি পিটিআই সমর্থকেরা। হাজার হাজার কর্মী রাস্তায় ও পার্কে অবস্থান করছেন। তাঁদের সঙ্গে পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষীদের বারবার সংঘর্ষের খবর মিলছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে আরও কঠোর পদক্ষেপের কথা ভাবছে পাকিস্তান সরকার। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহ আগেই জানিয়ে দিয়েছেন, আন্দোলনকারীদের রাজধানীতে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তারিক ফজল চৌধুরী জানিয়েছেন, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শুক্রবার রাতে মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি।

এই পরিস্থিতির রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। খাইবার পাখতুনখাওয়ায় ক্ষমতায় রয়েছে ইমরানের দলই। ফলে সেখান থেকে লং-মার্চ নির্বিঘ্নে এগোবে বলে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে প্রদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় কড়াকড়ি বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন জেলার প্রবেশপথ বন্ধ করে আন্দোলনকারীদের আটকে রাখার চেষ্টা চলছে। পেশোয়ারের মতো বড় শহরেও রাস্তায় নেমেছেন বহু পিটিআই সমর্থক।

শুক্রবার গভীর রাতে প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী তথা পিটিআই নেতা সোহেল আফ্রিদি সীমান্তের দিকে রওনা দেন। সমর্থকদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, রাজধানীতে পৌঁছনোর পথ আগে থেকে জানানো হবে না। পরিস্থিতির দিকে নজর রেখে সব সময় প্রস্তুত থাকতে হবে।

এদিকে, খাইবার পাখতুনখাওয়া থেকে পাঞ্জাবের দিকে এগোনোর চেষ্টা করছেন আন্দোলনকারীরা। সাবির শহরকে ঘিরে আগামী রবিবার সংঘাতের আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। খাইবার পাখতুনখাওয়ার গভর্নর ফয়সল করিম কুন্ডি আন্দোলনকারীদের সতর্ক করে জানিয়েছেন, সারাতে প্রবেশের চেষ্টা করলে তার পরিণতি ভাল হবে না। পাঞ্জাবেও পিটিআইয়ের উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন থাকায় বিক্ষোভ যাতে অন্য প্রদেশে ছড়িয়ে না পড়ে, সেই চেষ্টাই করছে প্রশাসন।

এই অস্থিরতার কেন্দ্রে রয়েছেন ইমরান খান। ২০২৩ সালের অগস্ট থেকে জেলে বন্দি পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। দুর্নীতির মামলায় গ্রেফতারির পর তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ইমরানের ভবিষ্যৎ শুধু সরকারের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে না। সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সংঘাতও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। দুর্নীতির মামলার পাশাপাশি সেনা আইনেও ইমরান ও তাঁর কয়েক জন সহযোগীর বিচার চলছে।

ইমরানের স্বাস্থ্য ও বন্দিদশা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রাক্তন ক্রিকেটাররাও তাঁর মুক্তির দাবিতে সরব হয়েছেন বলে খবর। ফলে একদিকে রাস্তায় পিটিআইয়ের আন্দোলন, অন্যদিকে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান এবং সেনাবাহিনীর ভূমিকা, সব মিলিয়ে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। এখন দেখার, ইসলামাবাদমুখী এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়।