৮৫ বছর বয়সে বিশ্বমঞ্চে সম্মানিত দক্ষিণ আফ্রিকার (South Africa) প্রাক্তন বিচারপতি। ম্যান্ডেলার পক্ষে আইনি লড়াই থেকে রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার প্রধান—দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতি! আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা এবং যুদ্ধাপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার লড়াইয়ে বড় স্বীকৃতি। ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার (Nobel Peace Prize) পেলেন ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত দক্ষিণ আফ্রিকার বিশিষ্ট আইনজ্ঞ নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই (Navanethem Navi Pillay)। শুক্রবার, ৯ অক্টোবর নরওয়ের নোবেল কমিটি এই পুরস্কার ঘোষণা করেছে। শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক আইনকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘদিনের অবদানকেই এই সম্মানের মাধ্যমে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে এবারও শান্তি পুরস্কার জুটলো না ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) কপালে। যদিও আগেই তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে তিনি আটটি যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছেন এবং আগের যেকোনো নোবেলজয়ীর চেয়ে শান্তির জন্য বেশি কাজ করেছেন। তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কার না দেওয়া হলে তা নোবেল কমিটির জন্য ‘বড় অসম্মানের’ হবে। ট্রাম্প দাবিও করেছিলেন মাচাদো তাঁকে বলেছিলেন যে তিনি নিজে এই পুরস্কারের যোগ্য নন, বরং ট্রাম্পই এর যোগ্য।
১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে এক ভারতীয় তামিল পরিবারে জন্ম নাভি পিল্লাইয়ের। বর্ণবৈষম্যমূলক অ্যাপারথাইড শাসনের সময় বেড়ে ওঠা পিল্লাই কর্মজীবনের শুরু থেকেই জাতিগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে শামিল হন। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়ান তিনি। নেলসন ম্যান্ডেলা-সহ একাধিক অ্যাপারথাইড-বিরোধী আন্দোলনকারীর পক্ষে আইনি লড়াইয়ের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন এই আইনজ্ঞ। পরবর্তীকালে দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা বিচারপতি হিসেবে ইতিহাস তৈরি করেন তিনি।দক্ষিণ আফ্রিকার আদালত থেকে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদ—নাভি পিল্লাইয়ের কর্মজীবন বিস্তৃত হয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে। ১৯৯৯ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি রুয়ান্ডার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারপতি হিসেবেও দায়িত্ব সামলেছেন। এরপর ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের পদে ছিলেন তিনি। এই সময় বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা মোকাবিলা এবং মৌলিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন পিল্লাই।
আরও পড়ুন: পরিবেশবান্ধব পুজো করলেই পুরস্কার, সেরার শিরোপায় মিলবে ১ লক্ষ: ঘোষণা পুরমন্ত্রীর
শুধু আদালতের বিচারক হিসেবেই নয়, আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার মতো গুরুতর অপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক আইন কার্যকর করার পক্ষে বরাবরই সরব থেকেছেন তিনি। রাষ্ট্র বা ক্ষমতাশালী নেতারাও যাতে আইনের ঊর্ধ্বে না থাকেন, সেই নীতির ওপর জোর দিয়েছেন পিল্লাই। রাষ্ট্রের হিংসা ও সংঘাতের শিকার মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইও তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। অধিকৃত প্যালেস্টাইন ভূখণ্ড নিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতিত্বও করেছেন নাভি পিল্লাই। নোবেল কমিটির বিচারে, পিল্লাইয়ের দীর্ঘ কর্মজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল নৈতিক দৃঢ়তা, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অঙ্গীকার এবং ক্ষমতাশালী পক্ষকেও জবাবদিহির আওতায় আনার প্রচেষ্টা। তাঁর কাজের ধারাবাহিকতা বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক স্তরে যুদ্ধাপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচারের দাবির সঙ্গে যুক্ত।
এবার সেই দীর্ঘ লড়াইয়ের স্বীকৃতি হিসেবেই ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন নাভি পিল্লাই। আগামী ১০ ডিসেম্বর নরওয়ের ওসলোয় আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হবে পুরস্কার। এর সঙ্গে থাকছে নোবেল পদক, শংসাপত্র এবং ১ কোটি ২০ লক্ষ সুইডিশ ক্রোনার অর্থমূল্য। বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার রক্ষার লড়াইয়ে নাভি পিল্লাইয়ের এই স্বীকৃতি আরও একবার সামনে আনল আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের গুরুত্ব—যেখানে ক্ষমতা নয়, আইনের শাসনই শেষ কথা।















