যন্তর মন্তরে CJP-র বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তার কড়াকড়ি, বাতিল ও পুনর্নির্ধারিত একাধিক ট্রেন। সাধারণ মানুষের যাতায়াতের অধিকার বনাম প্রতিবাদের অধিকার—দুইয়ের ভারসাম্য রাখার বার্তা শীর্ষ আদালতের (Supreme Court)। যন্তর মন্তরে প্রস্তাবিত বিক্ষোভ কর্মসূচিকে ঘিরে রাজধানীতে একের পর এক বিধিনিষেধ। কোথাও মেট্রো স্টেশন (Metro Station) বন্ধ রাখার প্রস্তাব, কোথাও বাতিল বা পুনর্নির্ধারিত ট্রেন। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের প্রশ্ন তুলে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলেন আইনজীবীরা। শুক্রবার মামলাটি শুনে জরুরি ভিত্তিতে বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য দিল্লি হাইকোর্টকে অনুরোধ করার ইঙ্গিত দিল শীর্ষ আদালত।

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে বিষয়টি উত্থাপন করেন প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিব্বল। তাঁর সঙ্গে বিধিনিষেধের প্রভাব নিয়ে বক্তব্য রাখেন অভিষেক মনু সিংভি এবং গোপাল শঙ্করনারায়ণন। সিব্বলের অভিযোগ, শনিবারের প্রস্তাবিত বিক্ষোভের জেরে দিল্লি ও জাতীয় রাজধানী অঞ্চলে (NCR) সাধারণ মানুষের যাতায়াত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, প্রতিবাদ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ হওয়ার কথা, অথচ তার প্রভাব পড়ছে বিপুল সংখ্যক মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। আদালতে সিব্বল বলেন, একদিকে ট্রেন বাতিল হচ্ছে, অন্যদিকে মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার কথা বলা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ছে। তাঁর প্রশ্ন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে কেন? ১০ অক্টোবর নিউ দিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনে আসার কথা ছিল এমন একাধিক ট্রেন বাতিল করা হয়েছে অথবা সেগুলির সময়সূচি বদলানো হয়েছে। পাশাপাশি ৫৭টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার প্রস্তাব কার্যকর হলে লক্ষ লক্ষ যাত্রী সমস্যায় পড়তে পারেন। প্রবীণ আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণনের যুক্তি, একটি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের জন্য গোটা শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করা যায় না। তাঁর মতে, নিরাপত্তার নামে নেওয়া প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপের সঙ্গে সম্ভাব্য পরিস্থিতির সামঞ্জস্য থাকা জরুরি।

সুপ্রিম কোর্ট জানায়, একদিকে নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে, অন্যদিকে অন্য নাগরিকদের গণপরিবহণ ও জরুরি পরিষেবা ব্যবহারের অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী প্রশ্ন তোলেন, প্রস্তাবিত বিক্ষোভের আয়োজকদের বক্তব্য না শুনেই কী শীর্ষ আদালত কোনও নির্দেশ দিতে পারে? কতজন বিক্ষোভকারী জমায়েত হতে পারেন, সেই তথ্যও জানতে চান তিনি। বিচারপতি বাগচীর পর্যবেক্ষণ, আয়োজকদের চিহ্নিত করে তাঁদের কাছ থেকে সম্ভাব্য জমায়েতের সংখ্যা জানা গেলে পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। সেই অনুযায়ী সরকারকেও বিধিনিষেধের মাত্রা পুনর্বিবেচনা করতে বলা যেতে পারে। সব ক্ষেত্রেই একযোগে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে পরিস্থিতি বুঝে পদক্ষেপ করার পক্ষেই সওয়াল করেন তিনি। বিক্ষোভের আয়োজকেরা সরাসরি আদালতে উপস্থিত না থাকায় তাঁদের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে বেঞ্চ। কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া হয়েছে, নাকি তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে—সেই তথ্যও জানতে চায় সুপ্রিম কোর্ট। সিব্বল জানান, দুপুর ২টোর সময় মামলাটি উঠলে তিনি বিক্ষোভের আয়োজকদের এক প্রতিনিধিকে নিয়ে আদালতে ফিরবেন।

প্রসঙ্গত,মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের জবাবদিহি এবং পদত্যাগের দাবিতে শনিবার দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)। সেই কর্মসূচিকে ঘিরেই রাজধানীতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। দিল্লি পুলিশ শুক্রবার জানিয়েছে, বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়নি। পুলিশের দাবি, আগের একটি বিক্ষোভের সময় আয়োজকেরা আইনি নির্দেশ ও নিজেদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি মেনে চলেননি। পাশাপাশি বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছে পুলিশ। পুলিশ আরও জানিয়েছে, নয়াদিল্লি এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (BNSS) ১৬৩ ধারা কার্যকর রয়েছে। এদিকে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দিল্লি হাই কোর্টে (Delhi High Court) জরুরি শুনানির আবেদন করেছিল ইন্ডিয়ান ইয়ুথ কংগ্রেস (IYC)। শুক্রবার সেই আবেদন জরুরি ভিত্তিতে শুনতে রাজি হয়নি হাইকোর্ট। মামলাটি আগামী সোমবার, ১২ অক্টোবর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে শনিবারের CJP-র কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে বিক্ষোভের অনুমতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত—তিনটি বিষয়ই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনজীবন সচল রাখার প্রশ্নে আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর রয়েছে।