“মাছি মারতে কেউ হাতুড়ি চালায় না!” একটি প্রতিবাদ কর্মসূচির জেরে গোটা শহরের পরিবহণ ব্যবস্থায় এমন প্রভাব পড়বে কেন? নিরাপত্তার প্রশ্নে দিল্লির প্রশাসনিক পদক্ষেপের যৌক্তিকতা নিয়ে কার্যত এই প্রশ্নই তুলল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নামে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুযোগ সংকুচিত করার প্রবণতা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এই মন্তব্য করেব। শনিবারের কর্মসূচিকে সামনে রেখে রেল ও মেট্রো পরিষেবা (Rail and Metro Services) সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার পরিবর্তে বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে দেখার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

দিল্লির যন্তর মন্তরে শনিবারের রাজনৈতিক কর্মসূচিকে ঘিরেই বিতর্কের সূত্রপাত। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে পথে নামার প্রস্তুতি নিয়েছে CJP- সহ একাধিক রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠন। কর্মসূচির আগেই ট্রেন চলাচলে পরিবর্তন, একাধিক পরিষেবা বাতিল এবং মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত সামনে আসে। তাতেই প্রশ্ন ওঠে, একটি নির্দিষ্ট এলাকার নিরাপত্তা সামলাতে গিয়ে রাজধানীর বিস্তীর্ণ অংশের যাতায়াত ব্যবস্থা ব্যাহত করা কতটা সমীচীন।

আরও পড়ুন: মোদি ২৫ বছরের উপহার! উত্তরপ্রদেশে বদলাচ্ছে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম! ঘোষণা যোগীর

বিষয়টি আদালতে নিয়ে যান সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এমএ বেবি। তাঁর আইনজীবী কপিল সিব্বল শুনানিতে পরিবহণ পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারীদের চলাচলে বাধা তৈরির পাশাপাশি এই সিদ্ধান্তের মাশুল গুনতে হতে পারে এমন বহু মানুষকে, যাঁদের সঙ্গে কর্মসূচির কোনও সম্পর্কই নেই। প্রতিদিনের কাজ, অফিস কিংবা অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনে যাঁদের যাতায়াত করতে হয়, তাঁরাও এর ফলে সমস্যায় পড়তে পারেন।

মামলাটি শুনেছে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি ও বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ। আদালতের বক্তব্যে উঠে আসে, দিল্লির মতো ব্যস্ত শহরে গণপরিবহণের গুরুত্ব আলাদা করে বোঝানোর প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষ কর্মস্থলে পৌঁছতে কিংবা বাড়ি ফিরতে ট্রেন ও মেট্রোর উপর নির্ভর করেন। দিল্লির সঙ্গে গুরুগ্রাম ও গ্রেটার নয়ডার মতো সংলগ্ন অঞ্চলের যোগাযোগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে পরিষেবা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের প্রভাব যে একটি প্রতিবাদস্থলের সীমানায় আটকে থাকবে না, তা প্রশাসনের বিবেচনায় রাখা দরকার।

আরও পড়ুন: বাইপাসের ধাবা-বেকারি নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ! তদন্তে বিশেষ কমিশন

নিরাপত্তার যুক্তিকে অবশ্য পুরোপুরি অস্বীকার করেনি আদালত। বরং পরিস্থিতি বুঝে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ প্রশাসনের রয়েছে বলেই জানিয়েছে বেঞ্চ। কিন্তু সেই ব্যবস্থা এমন হতে হবে, যাতে ঝুঁকি সামলানোর পাশাপাশি নাগরিকদের স্বাভাবিক চলাচলও বজায় থাকে। কোনও নির্দিষ্ট পরিস্থিতির মোকাবিলায় গোটা পরিবহণ ব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়া তার সমাধান হতে পারে না প্রধান বিচারপতির মন্তব্যে সেই বার্তাই স্পষ্ট হয়েছে।

মেট্রো পরিষেবা নিয়ে আদালতের নির্দেশও তাৎপর্যপূর্ণ। শনিবার পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী ট্রেনের সংখ্যা কমানো যেতে পারে। একই সঙ্গে, কোন কোন রাস্তা বন্ধ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে, তা নতুন করে খতিয়ে দেখার কথাও বলেছে বেঞ্চ। সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সমস্যা কমাতে বিধিনিষেধে সংশোধন আনার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছে শীর্ষ আদালত। অন্যদিকে কেন্দ্রের তরফে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা জানিয়েছেন, রেল ও মেট্রো সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়টি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করবেন তিনি। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন।

আরও পড়ুন: এটা কোনও ভোট হয়েছে! উপনির্বাচনের ফলকে ফুৎকারে উড়িয়ে কটাক্ষ মমতার

একটি প্রতিবাদ কর্মসূচিকে ঘিরে নিরাপত্তার প্রস্তুতি কত দূর পর্যন্ত যেতে পারে, এই মামলায় সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে। সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান, পরিস্থিতি সামলানোর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিপর্যস্ত করা উচিত নয়। প্রধান বিচারপতির এক বাক্যের মন্তব্যেই ধরা পড়েছে সেই অসন্তোষ। নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে, কিন্তু তার জন্য অযথা বড় মাপের পদক্ষেপ কেন!