‘মা’—ছোট্ট এই শব্দটির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক মহাসমুদ্রের গভীরতা। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস জুড়ে যাঁর অস্তিত্ব। ভালোবাসা, শাসন, অভিমান, কিংবা জীবনের কঠিনতম লড়াইয়ে এক চিলতে সুখ ও সান্ত্বনা— সবকিছুরই শেষ আশ্রয় মায়ের আঁচল। জীবনের চড়াই-উতরাই পার করার শক্তি এবং এগিয়ে যাওয়ার মূল প্রেরণা আসে তাঁরই আড়ালে থাকা প্রার্থনা থেকে। মা ছাড়া জীবন যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনই সমাজও অচল। সেই নিঃস্বার্থ মাতৃত্ব এবং নারীশক্তিকে কুর্নিশ জানাতেই সম্প্রতি সম্পন্ন হল “আমার মা আমার দুর্গা” অনুষ্ঠানের তৃতীয় সংস্করণ।

আরও পড়ুন: ঢেলে সাজবে পুলিশবাহিনী, হবে বিপুল নিয়োগ: সময়সীমা ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর
এই অনন্য ও মহতী অনুষ্ঠানের মূল ভাবনা এবং সামগ্রিক পরিকল্পনার নেপথ্যে রয়েছেন দেবযানী লাহা ঘোষ। তাঁর মতে, মা কেবল একটি পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু বা চার দেওয়ালের রক্ষাকর্তা নন; তিনি আসলে ঘরের সেই চালিকাশক্তি, যা দেবীর দশভুজা রূপেরই এক মানবিক প্রতিচ্ছবি। দেবীরূপে মাকে দেখার এবং সমাজের বুকে তাঁদের যথাযোগ্য সম্মান দেওয়ার এই বিশেষ প্রয়াস প্রথম বছর থেকেই দর্শকদের মন ছুঁয়ে গেছে। আর এই মহৎ উদ্যোগের শুরু থেকেই সক্রিয়ভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন টলিউডের প্রথম সারির অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। দেবযানী লাহা ঘোষ এবং ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের যৌথ আন্তরিকতা ও নিরলস পরিশ্রমে একসময়ের একটি ছোট্ট ভাবনা আজ এক বিশাল এবং মর্যাদাপূর্ণ মহীরূহে পরিণত হয়েছে।

আরও পড়ুন: সেনা অফিসারের পরিচয়ে প্রতারণা, নবগ্রামে ধৃত ভুয়ো কর্নেল
এবারের বড় আকর্ষণ ছিল তারকা সমাগম। বিনোদন জগৎ থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের কাজের মাধ্যমে নজির গড়া একঝাঁক কৃতী ব্যক্তিত্ব এদিন এই মঞ্চ আলো করে উপস্থিত ছিলেন। তবে এই আয়োজন কেবল গ্ল্যামার বা চটকদারিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরের, পর্দার আড়ালে থাকা লড়াই-সংগ্রামের মানুষদের এই গৌরবময় মঞ্চে এনে সম্মানিত করাটাই ছিল এই অনুষ্ঠানের আসল সাফল্য।
এ বছর এই মঞ্চ থেকে সমাজের একঝাঁক গুণী মানুষকে তাঁদের অবদানের জন্য বিশেষ সম্মানে ভূষিত করা হয়। সম্মান প্রাপকদের তালিকায় ছিলেন পৌলমী বসু, মহুয়া চ্যাটার্জি, সুমনা চ্যাটার্জি, বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. শকুন্তলা চক্রবর্তী, বাচিক শিল্পী ঊর্মিমালা বসু, অভিনেতা চিরঞ্জিত চক্রবর্তী, বর্ষীয়ান অভিনেত্রী মুনমুন সেন, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব দেবযানী কুমার, রায়া ভট্টাচার্য, রেশমি সেন, আলোকানন্দা রায়, সোহাগ সেন, শাশ্বতী পালিত, লাজবন্তী রায়, কেয়া বিশ্বাস এবং ঊষা বিষয়ী সহ আরও অনেকে। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই ব্যক্তিত্বদের অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

আরও পড়ুন: “ভয় দেখাবেন না!” মুক্তির পর আঘাতের চিহ্ন দেখিয়ে ক্ষোভ উগরে দিলেন আমিরের ভাইঝি
অনুষ্ঠানের অন্যতম আবেগঘন ও সংবেদনশীল দিকটি ছিল ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের সংস্থা ‘ভাবনা আজ ও কাল’-এর বিশেষ উদ্যোগ। গ্ল্যামারের আলো ছাড়িয়ে এই মঞ্চ একাত্ম হয়ে গিয়েছিল সাধারণের জীবনযুদ্ধের সঙ্গে। এদিন অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে সম্মানিত করা হয় সেইসব মায়েদের, যাঁরা প্রতিদিন ক্যানসারের মতো মারণ ব্যাধির সঙ্গে লড়াই করে জয়ী হয়েছেন অর্থাৎ ক্যানসার সারভাইভারদের এবং যাঁরা অত্যন্ত ধৈর্য ও মমতার সঙ্গে তাঁদের মূক-বধির সন্তানদের বড় করে তুলছেন। এই মায়েদের অদম্য জেদ এবং লড়াইয়ের গল্প উপস্থিত সকলের চোখে জল এনে দেয় এবং তাঁদের এই লড়াইকে কুর্নিশ জানায় গোটা প্রেক্ষাগৃহ।

আরও পড়ুন: ছকে বাঁধা আন্দোলন নয়, 'শিব তাণ্ডবের’ ছন্দেই পথে বিরোধীরা: রাহুল
টানা তিন বছর ধরে সাফল্যের সঙ্গে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান প্রতিবারই নিজের পরিধি ও জনপ্রিয়তাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। প্রথম সংস্করণের পর থেকে যেভাবে সাধারণ মানুষ এবং বিশিষ্টজনেরা এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিদের মতে, বর্তমানের ব্যস্ত ও জটিল সময়ে দাঁড়িয়ে মাকে কেন্দ্র করে, নারীশক্তিকে কুর্নিশ জানিয়ে এমন আয়োজন সমাজে এক অত্যন্ত ইতিবাচক ও গভীর বার্তা দেয়। আয়োজকদের আশা এবং দৃঢ় বিশ্বাস যে, আগামী দিনে এই উদ্যোগ আরও বড় রূপ নেবে, আরও অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে এবং সমাজের প্রতিটি কোণ থেকে লড়াই করে চলা মায়েদের এই মঞ্চে এনে তাঁদের প্রাপ্য সম্মান তুলে দেওয়া সম্ভব হবে।















