" তোমায় কেন লাগছে
এতো চেনা
এতো আপন ভাবছি
কেন তোমায়
বলতে পারো প্রথম
দেখা কোথায়,
প্রথম দেখা কোথায় ? "
প্রথম দেখা ফ্লোরেন্সের এক বসন্ত উৎসবে। কবির বয়স তখন মাত্র নয়। এ বয়সে তেমন কিছু কি হয়? হয় ।
কার সঙ্গে কার দেখা ?
দান্তে-র সঙ্গে বিয়াত্রিচে-র।
গাঢ় লাল পোশাকে উজ্জ্বল বিয়াত্রিচের বয়স তখন মাত্র আট। প্রথম দেখাতেই প্রেম। তবে এ প্রেম বড়ই একতরফা।
দান্তে প্রেমে বিভোর। কিন্তু বিয়াত্রিচে নির্বিকার। তবুও দান্তের জীবনে কবিতা এলো মহাসমারোহে। এরপর কেটে গেল দীর্ঘ ৯ বছর দেখাসাক্ষাৎহীন।
অবশেষে দান্তে যখন ১৮ , ফ্লোরেন্সেরই এক রাস্তায় আবার দেখা দুজনের। সাদা পোশাকে অপরূপা বিয়াত্রিচে রাস্তার ওপার থেকে দান্তেকে দেখে মিষ্টি হেসে মৃদু মাথা ঝুঁকিয়ে সামান্য সৌজন্য বিনিময় সেরে চলে গেলেন। চলে তো গেলেন, কিন্তু দান্তের হৃদয়ে চিরদিনের জন্য রয়ে গেলেন। সামান্য ঘটনাটি চিরকালের জন্য হয়ে রইলো অসামান্য।
" আর তো হলো না দেখা
জগতে দোঁহে একা
চিরদিন ছাড়াছাড়ি
যমুনা তীরে... " ।
প্রথম দেখাতেই বিয়াত্রিচেকে ভালো লেগে যায় কবি দান্তের। অথচ কখনোই প্রেয়সীকে নিজের অনুভূতির কথা জানাতে পারেন নি কবি। সবটাই গোপন রেখেছিলেন লোকনিন্দা এবং সমাজে বিয়াত্রিচের সম্মান নষ্টের ভয়ে। অন্য নারীদের দিকে মনোযোগ দেওয়ার ভান করতেন, কিন্তু সবসময় খুঁজে বেড়াতেন বিয়াত্রিচেকেই।
" তেরা মুঝসে হ্যায় পহেলে কা নাতা কোই
য়্যুঁহি নেহি দিল
লুভাতা কোই... "
সমাজ তো অনুমতি দিল না। পরিবারও রইলো নীরব। ' মায়াবনবিহারিণী হরিণী ' হয়ে রয়ে গেলেন বিয়াত্রিচে। তাঁর বিয়ে হয়ে গেলো এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। স্বামী ব্যাঙ্ক ব্যবসায়ী সিমন দে বার্দি।
কয়েক বছর যেতে না যেতেই ঘটে গেল বড়ো অঘটন। মাত্র ২৪ বছর বয়সে মারা গেলেন বিয়াত্রিচে। তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যু, এইভাবে অকালে চলে যাওয়া একেবারে ভেঙে দিয়ে যায় কবিকে। তীব্র এক বিষাদে ডুবে যান কবি। তারপর সময়ের নিয়মে একসময় বিষাদসিন্ধু থেকে মাথা তুললেন দান্তে। ভাবলেন এই পবিত্র ভালবাসাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে শুধুমাত্র কবিতা। রচনা করলেন ' লা ভিটা নুয়োভা' ( La Vita Nuova ) , নতুন জীবন। এ কাব্যগ্রন্থে চিরকালের জন্য থেকে গেল তাঁদের প্রথম দেখা, একতরফা ভালোবাসা আর বিয়াত্রিচের অকাল প্রয়াণ । বিয়াত্রিচে তো শুধু অপরূপা নন, তিনি এক পবিত্র, অজরা-অতুলা নারী, পৃথিবীর যাবতীয় সৌন্দর্য এসে মিশেছে যে নারীর মোহনায়।
... " দূর হতে আমি তারে
সাধিব
গোপনে বিরহডোরে
বাঁধিব --
বাঁধন-বিহীন সেই,
যে-বাঁধন , অকারণ। "
শুধু কি এটুকুই ? ঘরে না এলেও মনে তার নিত্য আসা-যাওয়া চলতেই থাকলো। কবির সমগ্র অস্তিত্ব হয়ে উঠলো বিয়াত্রিচেময়। যদিও কবিকে বিয়ে করতে হলো একটা। স্ত্রীর নাম জেম্মাস দোনাতি। ফ্লোরেন্সের বেশ প্রভাবশালী দোনাতি পরিবারের মেয়ে জেমা। তাঁদের সন্তানও হলো একাধিক। কিন্তু জেমা কবির স্বপ্নের নারী হয়ে উঠতে পারেন নি কোনোদিনই। কবির ধ্যানজ্ঞান ছিলেন বিয়াত্রিচে। তিনিই ছিলেন
কবির ' পরাণ যাহা চায় ' ।
... " আমি তোমার বিরহে
রহিব বিলীন,
তোমাতে করিব বাস,
দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী
দীর্ঘ বরস-মাস । "
বিয়াত্রিচেকে নিয়ে দিনের পর দিন লিখে চলেছেন কবি দান্তে অলিঘিয়েরি , ( Dante Alighieri , 1265 -- 1321 ) কিন্তু কিছুতেই শান্তি পাচ্ছেন না। মনের মতো হচ্ছে না লেখাগুলো। শেষে কবি প্রতিজ্ঞা করলেন এমন কিছু লিখবেন তাঁর আরাধ্যাকে নিয়ে, যা কোনো নারীকে নিয়ে কেউ কখনো লেখেন নি। তখনই লিখতে শুরু করলেন তাঁর অমর মহাকাব্য ডিভাইনা কামেডিয়া ( Divina Commedia ) , যা ' ডিভাইন কমেডি ' নামে প্রসিদ্ধ। এই মহাকাব্যের প্রধান তিনটি ভাগ হলো ইনফার্নো ( Inferno ) বা নরক, পুরগাতোরিও ( Purgatorio ) বা প্রায়শ্চিত্ত এবং প্যারাডিসো ( Paradiso ) বা স্বর্গ।
বাস্তবে চিরদিনের মতো ছাড়াছাড়ি হলেও কাব্যে তিনি অমর করে রাখলেন তাঁর প্রিয়াকে। এখানে বিয়াত্রিচে যেন প্রায় ঈশ্বরী , এখানে তিনি অপার্থিব। এই মহাকাব্যের নরক ও প্রায়শ্চিত্ত অংশে কবি দান্তের সফরের গাইড হিসেবে রয়েছেন কবি ভার্জিল। কিন্তু স্বর্গের প্রবেশদ্বারে এসে পথপ্রদর্শক হিসেবে দান্তের হাত ধরেন স্বয়ং বিয়াত্রিচে ( Beatrice) । দুজনে হাতে হাত রেখে প্রবেশ করেন স্বর্গে এবং হাঁটতে থাকেন অবর্ণনীয় এক আলোর পথে। আর একটু পরেই দেবতারা সকলে বেরিয়ে এসে সহর্ষে স্বাগত জানাবেন কবি ও তাঁর প্রেয়সীকে। আহা, ' আমরা একত্রে আছি বইয়ের পাতায়। '