ভরা বর্ষা হোক বা কনকনে শীত, পুজোপার্বণ, উৎসব হোক বা দরিদ্রনারায়ণ সেবা কিংবা খাদ্যোৎসব— শো স্টপার কিন্তু খিচুড়ি। যাকে বাদ দিলে বাঙালির ষোলোআনাই মাটি। খিচুড়ি শুধু বাংলায় নয়, বিভিন্ন রাজ্যে এমনকী প্রতিবেশী দেশেও নানা বর্ণে, নানা স্বাদে, ঐতিহ্যে আভিজাত্যে স্বমহিমায় বিরাজমান। আট থেকে আশির কাছে খিচুড়ির কোনও বিকল্প নেই। লিখলেন অনির্বাণ ঘোষ।
বাঙালির কথায়-কথায় খিচুড়ি। ‘ভাই, কেসটা ঘেঁটে খিচুড়ি হয়ে গেছে রে!’ ‘সব কিছু নিয়ে খিচুড়ি পাকাস না তো!’ সে মুখের ভাষাতে খিচুড়ি আসুক বা না আসুক, বাঙালির রসনাতৃপ্তির লিস্টে খিচুড়ি কিন্তু বেশ ওপর দিকেই তার অবস্থান ধরে রেখেছে। বর্ষার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে খিচুড়ি। বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি অথচ মেনুতে খিচুড়ি নেই, ভাবাই যায় না! শীতকালের কড়া ঠান্ডা, সেখানেও খিচুড়ির আধিপত্য। এমন এক পদ, যা সমস্ত বিত্তের সীমারেখা লঙ্ঘন করেছে। নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত— খিচুড়ি ভালবাসে না, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দায়। আকাশ-কালো-করা ভরা বাদল দিনে খিচুড়ি ছাড়া কি কিছু ভাবা যায়! শুধু বর্ষা বা শীত নয়, যে কোনও ঋতুতে হওয়া, পুজোআচ্চায় ঠাকুরের ভোগ হিসেবেও সবার আগে সেই খিচুড়িই প্রাধান্য পায়।২০১৭ সালে খিচুড়ি ‘ব্র্যান্ড ইন্ডিয়া ফুড’ হিসেবে ঘোষিত হয়। দেশের সবস্তরের মানুষের কাছে পুষ্টিকর, সহজপাচ্য এবং ‘কমফর্ট ফুড’ হিসেবে এর গ্রহণযোগ্যতা থাকায় একে ভারতের প্রতীকী ও স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু কী এই খিচুড়ি?
এক কথায় বলতে গেলে চাল ও ডালের মিশ্রণে একটি সহজলভ্য সুস্বাদু খাদ্য। যার ইতিহাস আদি অনন্তকাল আগে লেখা হয়ে গেছে।
আনুমানিক দু’হাজার বছরেরও বেশি পুরনো, চাল-ডালের এই সুস্বাদু মিশ্রণ। মহারাষ্ট্রের ‘তের’ নামক প্রাচীন স্থানে খননকার্য চালিয়ে প্রায় দু-হাজার বছর আগের চাল ও মুগডালের পোড়া অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে— যা এক অভূতপূর্ব প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ খিচুড়ির প্রাচীনতার। মৌর্য যুগ ও বৈদিক সাহিত্যে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজসভায় ও মেগাস্থিনিসের লেখায় এর প্রমাণ রয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব ৩০৫ অব্দে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজত্বকালে ভারতে আসা গ্রিক দূত সেলিউকুসের বিবরণেও খিচুড়ির উল্লেখ রয়েছে। প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্র ও বৈদিক সাহিত্যেও খিচুড়ির আদি রূপের কথা বলা রয়েছে। মুঘল আমল ও ঔপনিবেশিক যুগেই রাজদরবারের এই নবাবি খাবার সাধারণের হেঁশেলেও জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
খিচুড়ি নাম এল কোথা থেকে?
তখনকার ভারতে সংস্কৃত ভাষার আধিপত্য ছিল ব্যাপক হারে। সংস্কৃত শব্দ ‘খিচ্চা’ বা ‘খিচ্চিকা’ থেকেই খিচুড়ি নামটা এসেছে বলে মনে করা হয়। যার অর্থ চাল ও ডাল অথবা অন্য কোনও শস্যের মিশ্রণে তৈরি কোনও পদ। ‘খিচ্চা’ থেকে পরবর্তীতে এটি প্রাকৃত ভাষায় ‘খিচ্চড়ি’ এবং কালক্রমে বাংলা ও হিন্দি-সহ অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষায় ‘খিচুড়ি’ বা ‘খিচড়ি’ নামে পরিচিত হয়। যেহেতু চাল ও ডাল অথবা অন্য কোনও শস্যের মিশ্রণে এই পদটি তৈরি করা হয়, তাই বিভিন্ন উপাদান একসঙ্গে মিশে যাওয়ার কারণে রূপক অর্থে বা আভিধানিক অর্থেও অনেক কিছু গোলমেলে বা একসঙ্গে মিশে থাকাকে ‘খিচুড়ি পাকানো’ বা ‘খিচুড়ি অবস্থা’ বলা হয়ে থাকে।তৎকালীন নবাবি ভারতে খিচুড়ি এক রাজকীয় পদ হিসেবেই সমাদৃত ছিল। মুঘল সম্রাট আকবরের অন্যতম প্রিয় খাবার ছিল খিচুড়ি। যার প্রমাণ আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে পাওয়া যায়। সেখানে আবুল ফজল বিভিন্ন ধরনের খিচুড়ির রেসিপির উল্লেখ করেছেন।
গুজরাট জয়ের পর আকবর প্রিন্স জাহাঙ্গিরকে এই পদ খাইয়েছিলেন এবং সেই খাবারের স্বাদে মুগ্ধ হয়ে রাজকীয় হেঁশেলে আদর করে এর নাম দিয়েছিলেন ‘লাজিজান’।ঔপনিবেশিক যুগে ব্রিটিশরা খিচুড়িকে নিজেদের দেশে নিয়ে যায় এবং এর সাথে স্মোকড ফিশ ও ডিম মিশিয়ে ‘কেজরি’ নামে ব্রেকফাস্টের এক জনপ্রিয় খাবারে রূপান্তরিত করে। এ তো গেল খিচুড়ির ইতিহাস-কথা।২০১৭ সালে ‘ব্র্যান্ড ইন্ডিয়া ফুড’ তকমা পাবার পরে আর শুধু ভারত নয়, খিচুড়ি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে দক্ষিণ এশিয়ার অনেকগুলি দেশে। ভারত, বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তানেও যথেষ্ট জনপ্রিয় খিচুড়ি। পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের চারসাদ্দা অঞ্চলের মোটা চাল ও মাংস দিয়ে রান্না করা বিশেষ এক ধরনের খিচুড়ি ‘চারসাদ্দা খিচুড়ি’ নামে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।ভারতের প্রাদেশিক খিচুড়ি চাল-ডালের মিশ্রণ হলেও ভারতের এক-এক প্রদেশে এক-একরকমভাবে রান্না করা হয় খিচুড়ি। এবং সেই রান্নার প্রকারভেদে আঞ্চলিকভাবে এর কিছু আলাদা নামকরণও হয়ে গেছে।
বিহার, ঝাড়খণ্ড ও ছত্তীসগঢ় : এই তিন রাজ্যেই খাওয়া হয় বিশেষ ‘ভুঞ্জি’ বা ‘ভুনাখিচুড়ি’। সাধারণ নরম খিচুড়ির মতো এটি গলে যায় না বরং বেশ ঝরঝরে হয়। চাল ও ডাল প্রথমে ঘিয়ে ভেজে নিয়ে মশলা দিয়ে কড়াইয়ে কষে এটি রান্না করা হয়।
উত্তরপ্রদেশ ও উত্তরাখণ্ড : এই দুই রাজ্যে খিচুড়ির প্রধান উপাদান বিউলির ডাল। এখানে খিচুড়ি তাই ‘উরাদ খিচড়ি’। উত্তর ভারতে মকর সংক্রান্তিতে এটি খুব জনপ্রিয়। ঘি, জিরে, হিং এবং গরম মশলার ফোড়ন দিয়ে চাল ও বিউলির ডাল একসঙ্গে সেদ্ধ করে ‘উরাদ খিচড়ি’ রান্না করা হয়।
জম্মু ও কাশ্মীর : এই দুই রাজ্যে খিচুড়ি তৈরি করা হয় সোনামুগ ডাল ও চাল দিয়ে। তাই এখানকার খিচুড়ির নাম ‘মোঙ্গ’ বা ‘মোং খেতচির’।
অসম : অসমিয়ারা খিচুড়িকে ‘খার’ নামে ডাকে। কলার খোসা বা গাছের ছাই থেকে তৈরি জল দিয়ে, মূলত বিউলির ডাল এবং চাল সহযোগে এই বিশেষ খিচুড়ি রান্না করা হয়।
অরুণাচল প্রদেশ : প্রায় সব রান্নায় বেগুন দেওয়া এই রাজ্যের বৈশিষ্ট্য। খিচুড়িতেও তাই বেগুনের আধিক্য থেকেই যায়। এই রাজ্যে খিচুড়িকে ডাকা হয় জা দোজ নামে।
নাগাল্যান্ড : এই প্রদেশে খিচুড়িকে ডাকা হয় ‘গালহো’ নামে। এটি কিন্তু একেবার মাংসাশী খিচুড়ি। এটি চাল, ডাল, শাকসবজি এবং স্মোকড বা ধোঁয়া দেওয়া মাংস দিয়ে তৈরি একটি সুস্বাদু ও নরম পদ।
মণিপুর : ভারতের উত্তর-পূর্বের প্রায় সব রাজ্যেই এর নাম ‘মণিপুরি খিচুড়ি’।
মেঘালয় : মেঘালয়ে তৈরি করা হয় বিশেষ আমিষ খিচুড়ি জাদোহ।
ওড়িশা : এদিকে বাংলার প্রতিবেশী এই রাজ্যে খাওয়া হয় ‘মিঠা খিচুড়ি’।
এছাড়াও মধ্যপ্রদেশে ‘সাবুদানা খিচুড়ি’, অন্ধ্রপ্রদেশের ‘পুলাগাম’, তামিলনাড়ুর ‘ভেন পোঙ্গাল’, কেরলের ‘মাথান খিচুড়ি’, কর্নাটকের ‘খারা পোঙ্গাল’, গোয়ার ‘মিষ্টি খিচুড়ি’, মহারাষ্ট্রের ‘বলাচা খিচুড়ি’, গুজরাতে আবার বিখ্যাত ‘বাগারেলি খিচুড়ি’, রাজস্থানে ‘কাঠিয়াওয়াড়ি খিচুড়ি’, পঞ্জাবে ‘তুর ডালের খিচুড়ি’ প্রসিদ্ধ।
















