আন্তর্জাতিক বামহাতি দিবসের সূচনা হয় ১৯৭৬ সালে। এই দিনটি পালনের উদ্যোগ চালু করেন দ্য লেফট-হ্যান্ডার্স ক্লাব-এর প্রতিষ্ঠাতা ডিন আর. ক্যাম্পবেল। মূল উদ্দেশ্য ছিল ডানহাতি প্রধান সমাজে বামহাতিদের যে চ্যালেঞ্জ এবং অসুবিধার মুখোমুখি হতে হয়, তার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা। মনে করিয়ে দিচ্ছেন দেবলীনা মুখোপাধ্যায়।

বিজ্ঞানী আইনস্টাইন, চিত্রকর লেওনার্দো দা ভিঞ্চি, দার্শনিক অ্যারিস্টটল, সংগীতজ্ঞ মোৎজার্ট, ধনকুবের বিল গেটস, ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কিংবা অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন। এঁরা প্রত্যেকেই সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন জগতের মানুষ হলেও এঁদের মধ্যে কিন্তু একটি মিল আছে। এরা প্রত্যেকেই এমন এক শ্রেণির অন্তর্গত, যা পৃথিবীর সব মানুষের মাত্র ১০-১১ শতাংশ নিয়ে গঠিত।

স্কালপচার অব বিবিলিকাল ডেভিড এবং সিস্টিন চ্যাপেল ফেস্কো বাম হাতেই গড়েছেন মাইকেলেঞ্জেলো বুওনারোত্তি। মাইকেলেঞ্জেলো মতো আরেক জগদ্বিখ্যাত শিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চিও ছিলেন বামহাতি। যদিও তিনি এমন সময়ের মানুষ ছিলেন যখন বাম হাতে কাজ করাকে ‘অশুভ’ হিসাবে দেখা হত। তবে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তিনি আঁকার ক্ষেত্রে বাম হাতকেই ব্যবহার করেছেন। এছাড়া লেখালিখি ও গবেষণাতেও বামহাতি ছিলেন তিনি। বামহাতিদের মধ্যে এ সময়ের বিখ্যাত মহিলা হলেন হলিউড অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট সিনিয়র বুশ, বিল ক্লিনটন, বারাক ওবামা— এ তিনজনই বামহাতি। একাধিক ছবিতে দেখা গেছে বাম হাতে কলম ধরে তাঁরা লিখছেন। তাঁদের সঙ্গে আছেন ভেনেজুয়েলার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ এবং ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও।  

গায়িকা লেডি গাগা, অভিনেতা কিয়ানু রিভস, উপস্থাপিকা অফরাহ উইনফ্রে, বিখ্যাত টেনিস খেলোয়াড় রড লিভার, ব্রিটিশ রাজপুত্র উইলিয়াম-সহ আরও অনেক বিখ্যাত মানুষ আছেন যাঁরা সবাই বামহাতি।

বাঁ-হাতি তালিকায় রয়েছেন ভারতের সেরা অভিনেতা বিগ-বি। দাদা সাহেব ফালকে সম্মান প্রাপ্ত লিভিং লিজেন্ড অমিতাভ বচ্চন একাধিক সিনেমায় বাঁহাতের ব্যবহার দেখিয়েছেন।

ভারতীয় ক্রিকেটের ভগবান মাস্টার ব্লাস্টার শচীনও একজন বামহাতি। বামহাতের জাদুতেই ক্রিকেট দুনিয়া মাতিয়েছিলেন তিনি। একের পর এক রেকর্ডও করেছেন বাঁহাতে। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, আমি বাঁহাতি (lefty) হতে পারি কিন্তু সবসময় সঠিক (right)। ডান শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘রাইট’, যার আরেক অর্থ ‘ঠিক’। তবে কি ‘বাম’ মানে ‘বেঠিক’! লাতিন শব্দ ‘সিনিস্টার’ অর্থ ‘বাঁ’। অথচ ইংরেজিতে অশুভ বা দুর্ভাগা বোঝাতে ব্যবহৃত হয় এই শব্দ। এভাবে যুগে যুগে নানা অযৌক্তিক বৈষম্যের শিকার হয়েছেন বাঁহাতিরা।বাঁ হাতের ভেলকি, বাঁ হাতের খেল, বাঁ হাতের ব্যাপার কিংবা কথায় বাঁ হাত ঢোকানো— বাঁ হাত নিয়ে এমন সব প্রবাদ হামেশাই ব্যবহার করি আমরা। আবার ছেলেদের বাঁ হাতের তালু চুলকালে নাকি অর্থব্যয় হয়। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে উল্টো, ঘটে অর্থযোগ। সমাজে এমন বিশ্বাসও চালু আছে। দেশে দেশে বাঁ হাত নিয়ে প্রচলিত কুসংস্কারও কম নয়। প্রাচীনকাল থেকেই বাঁহাতি মানুষদের সইতে হয়েছে নানা অপবাদ-অবজ্ঞা। তাঁদের এমনকী দুর্ভাগ্যের প্রতীকও মনে করা হত। ভারতীয় উপমহাদেশে বাঁহাতিদের ওপর নানা ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা ছিল। প্রাচীন মিশরে তাঁদের পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হত না। অথচ গবেষণা বলছে, বাঁহাতি মানুষেরা তুলনামূলকভাবে অধিক বুদ্ধিমান ও সৃষ্টিশীল। তাঁদের উপস্থিত বুদ্ধি বেশি। তাঁরা নাকি ডানহাতি মানুষের চেয়ে রোজগারও করেন বেশি।

একথা আসলে তাঁদের মনে করিয়ে দেওয়া দরকার যাঁরা এবছর নতুন নতুন দুর্গা পূজা করতে গিয়ে দেবী মূর্তির দশভুজা রূপ বাতিল করে সপ্ত ভুজা মূর্তির পরিকল্পনা করেছেন এবং ডান ও বাম দিকে সমসংখ্যক হাতে কল্পনাতেও আনতে পারছেন না। (বুঝতে অসুবিধা হলে সঙ্গের ছবিটি দেখে নিন) গবেষকরা জানাচ্ছেন, বাঁহাতি হওয়ার কারণ হিসেবে ৪০টির মতো জিন শনাক্ত করেছেন। আরেক গবেষণা অনুসারে, জন্মগ্রহণের সময় শতকরা ৭৫ ভাগ শিশুই বাঁহাতি হওয়ার বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মায়। তবে পরবর্তী সময়ে পরিবেশ ও জীবনযাপন পদ্ধতি মিলিয়ে শিশু ডানহাতিতে পরিণত হয়।প্লজ জেনেটিকস জার্নালে প্রকাশিত ম্যাশবলের একটি গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মানুষ বাঁহাতি হবে কি না তা নির্ভর করে জিনের ওপর।

গবেষণায় দেখা গেছে, মা-বাবা দুজন বাঁহাতি হলে সন্তানদের শুধু শতকরা ২৬ জন বাঁহাতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আবার গর্ভাবস্থায় ও প্রসবের সময় সন্তানের অবস্থান ও প্রি-ম্যাচিউর হলে বামহাতি হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।জানলে অবাক হবেন কেবল মানুষই নয়, অনেক পশু-পাখিও বাঁহাতি বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হয়। এক গবেষণায় বলা হয়, অস্ট্রেলিয়ান ক্যাঙ্গারুরা বাঁহাতি। যদিও দ্বিপদী প্রাণীর ক্ষেত্রে হয়তো এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। তবে চতুষ্পদ প্রাণীরা এ ধরনের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে না।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাঁহাতিদের মস্তিষ্কের ডানপাশ বেশি ব্যবহৃত হয়। এজন্যই সাধারণত বাঁহাতিরা বেশি উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন হন। কারণ বাম হাতিরা মস্তিষ্কের ডান প্রকোষ্ঠের ব্যবহার বেশি করেন। যেখানে যুক্তি, কারণ ও সৃজনশীলতার বিষয়গুলো প্রক্রিয়াকরণ করা হয়। ক্রিস এমসি ম্যামস ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন থেকে প্রকাশিত ডানহাতি ও বামহাতিদের ওপর লেখা একটি বইতে উল্লেখ করা আছে, বাঁহাতিদের জীবনের সাফল্য, প্রাপ্তি বা কৃতিত্বপূর্ণ কাজ, ডানহাতিদের তুলনায় ঈর্ষণীয়।

ক্রীড়াজগৎ ও রাজনীতিতেও বাঁহাতিদের সুবিধা বেশি ক্রীড়াজগতে ক্রিকেট, টেবিল টেনিস, ব্যাডমিন্টন, টেনিস, বেসবল খেলায় বাঁ-হাতিরা বেশ সুবিধা আদায় করে নিতে পারে। এমন অনেক খেলোয়ার আছেন বিশ্বে। ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশের সফল রাজনীতিবিদদের অনেকেই বাঁহাতি।২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের লাফায়েত কলেজ অ্যান্ড জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেখিয়েছেন, বাঁহাতিরা ডানহাতিদের চেয়ে ১০-১৫ শতাংশ বেশি উপার্জন করেন।