ভুটান সীমান্তের গা-ঘেঁষে ডুয়ার্সের কোলে লুকিয়ে থাকা এক অপূর্ব পাহাড়ি স্বর্গ হল ‘রঙ্গো’। বড় আকর্ষণ হল আদিম ও নিপাট সৌন্দর্য। প্রকৃতির নিজ হাতে ফুটিয়ে তোলা এক নিখুঁত ক্যানভাস। সপরিবার ঘুরে আসতে পারেন। লিখলেন সুনন্দা সাহা।
শিলিগুড়ি থেকে মাত্র সাতানব্বই কিলোমিটার দূরে, ভুটান সীমান্তের গা-ঘেঁষে ডুয়ার্সের কোলে লুকিয়ে থাকা এক অপূর্ব পাহাড়ি স্বর্গ হল কালিম্পংয়ের ‘রঙ্গো’। ছোট্ট গ্রামটি যেন প্রকৃতির নিজ হাতে ফুটিয়ে তোলা এক নিখুঁত ক্যানভাস। এখানে পৌঁছলেই চারপাশের স্নিগ্ধতা নিমেষেই মন ভালো করে দেয়। রঙ্গোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল এর আদিম ও নিপাট সৌন্দর্য। সকালে ঘুম ভাঙলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে তুষারাবৃত কাঞ্চনজঙ্ঘার সোনালী ঝিলিক, যা যে কোন মানুষের মন কেড়ে নিতে পারে। তার পাশেই বয়ে চলা ঝালং নদীর কলতান সারাক্ষণ এক জাদুকরী সুর তৈরি করে। এখানকার পাহাড়ি পথ, পাইন বনের গন্ধ আর স্থানীয় মানুষের সরল জীবনযাত্রা ভ্রমণপিপাসুদের বারবার টেনে নিয়ে যায়।
যান্ত্রিকতা ও ব্যস্ততার ভিড় থেকে দূরে, প্রকৃতির একদম কাছাকাছি কয়েকটা দিন কাটিয়ে দেওয়ার জন্য রঙ্গো এক আদর্শ ঠিকানা। মেঘ-পাহাড়ের অভাবনীয় সংমিশ্রণ, ভুটান সীমান্তের রোমাঞ্চ এবং ডুয়ার্সের বন্য রোমাঞ্চের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে এখানে।শিলিগুড়ি বা নিউ মাল জংশন থেকে যাত্রা শুরু করলেই পাহাড়ের বাঁকগুলো স্বাগত জানাবে। যত ওপরের দিকে উঠবেন, বাতাসের শীতলতা আর সবুজের গভীরতা বাড়বে। গৈরিবাস থেকে ৭ কিলোমিটার খাড়া চড়াই পথ পেরিয়ে যখন পাহাড়ের শীর্ষে অবস্থিত রঙ্গোতে পৌঁছাবেন, তখন মনে হবে আপনি পৃথিবীর এক গোপন স্বর্গে ঢুকে পড়েছেন। সিঙ্কোনা বাগানের জৌলুস আর নেওড়া ভ্যালি ন্যাশনাল পার্কের প্রবেশদ্বার হিসেবে এর পরিচিতি ভ্রমণপিপাসুদের মনে এক অদ্ভুত টান তৈরি করে।
পরিচয়হীন মেঘেদের সারি এখানকার আকাশে যেন সবসময় ঘুরে বেড়ায়। পাহাড় ঘেরা সবুজের মধ্যেই যদি নিজেকে খুঁজে পেতে চান তা হলে একবার আসতেই হবে। আচ্ছা তাও বাদ দিন! একবার ভেবে দেখুন দুটো দিন পাহাড়ি কোনও পাখির ডাকে ঘুম ভেঙে চোখ কচলাতে কচলাতে যদি মোহময়ী সূর্যোদয় দেখতে পান, তা হলে কেমন লাগবে? আমি নিশ্চিত আমার মতো আপনিও আর ফিরতে চাইবেন না। ঠিক এই কারণেই রঙ্গো হতে পারে আপনার ঠিকানা।
রঙ্গোতে পৌঁছেই ব্যাগপত্র হোম-স্টেতে ফেলে রেখে সোজা চলে যান নদীর কিনারায়। ঝালং নদীর পাথুরে বুক চিরে বয়ে যাওয়া স্বচ্ছ জল আপনার শরীরের সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে দেবে। ওপরে নীল আকাশ, আর পাশে গভীর জঙ্গল-মাঝখানে আপনি একলা পথিক। নদীর ওপরের ছোট কাঠের সেতুটি যেন আপনাকে এক রূপকথার জগতে নিয়ে যাবে।গ্রামের পথে হাঁটতে হাঁটতে দেখবেন পাহাড়ি শিশুদের সারল্যমাখা হাসি আর রঙিন ফুল দিয়ে সাজানো কাঠের বাড়িগুলো। এখানকার মানুষদের আতিথেয়তা এতটাই নিখুঁত যে আপনার মনেই হবে না আপনি অচেনা কোনও জায়গায় আছেন। রাতে হোম-স্টের বারান্দায় যখন গরম কফি বা মোমোর প্লেট নিয়ে বসবেন, তখন চারদিকের নিস্তব্ধতা আপনার মনের কথাগুলো চেঁচিয়ে বলতে সাহায্য করবে।যাঁরা ক্যামেরা হাতে হর্নবিল বা ব্রডবিল-এর মতো বিরল হিমালয়ান পাখির খোঁজে থাকেন, তাঁদের জন্য রঙ্গো হল ভূস্বর্গ। কুয়াশা মোড়া সকালে যখন পাখির ডাকে ঘুম ভাঙবে, তখন জানালার পর্দা সরালেই দেখবেন মেঘেরা আপনার ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছে। বেরিয়ে পড়ুন লেমন গ্রাসের সুগন্ধী বাগানে। সিঙ্কোনা গাছ থেকে কীভাবে জীবনদায়ী ওষুধ তৈরি হয়, তার রহস্য উন্মোচন করতে একবার ঘুরে আসতেই হবে। দলগাঁও ভিউ পয়েন্ট থেকে নিচে তাকালে মনে হবে কেউ যেন পাহাড়ের বুক চিরে একগাছি সাদা ফিতে রেখে দিয়েছে। সেটাই হল জলঢাকা নদী।
জিরো পয়েন্ট ও চিন বর্ডার ঘুরে আসা যায়। পাইন বনের রহস্যময় অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে দু-ঘণ্টার এক রোমাঞ্চকর ট্রেক করলে দেখা মেলে সুদূর চিন সীমান্তের। যাঁরা একটু অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়, তাঁদের জন্য এটি দারুণ এক অভিজ্ঞতা।ভারত-ভুটান সীমান্তের মেলবন্ধন রঙ্গো থেকে কিছুটা দূরেই রয়েছে বিন্দু-ভারত-ভুটান সীমান্তের শেষ জনপদ। এখানে জলঢাকা ব্যারেজের একদিকে ভারত আর অন্যদিকে ভুটান। পাহাড়ের গায়ে গায়ে ধাপচাষ আর কমলালেবুর বাগান দেখতে দেখতে চোখ জুড়িয়ে যাবে। যদি আকাশ পরিষ্কার থাকে, তবে বিন্দুর মাথা থেকে হিমালয়ের বরফশৃঙ্গগুলোর দেখা পাওয়া যেন সোনায় সোহাগা। হাতছানি দেয় রঙ্গো। সপরিবার ঘুরে আসতে পারেন।
কীভাবে যাবেন?
শিয়ালদহ বা হাওড়া থেকে ট্রেনে যেতে হবে নিউ জলপাইগুড়ি। সেখান থেকে দূরত্ব ৯৭ কিমি। বড় গাড়ির ভাড়া ৪,৫০০ টাকা, ছোট গাড়ি ৩,৫০০ টাকা।নিউ মাল জংশন থেকে ভাড়া কম। বড় গাড়ি ৩,০০০ টাকা আর ছোট গাড়ি ২,২০০ টাকা।
কোথায় থাকবেন?
আছে বেশকিছু হোটেল এবং হোমস্টে। থাকা-খাওয়ার কোনও অসুবিধা হবে না। খরচ মোটামুটি নাগালের মধ্যে। ব্যাগে একটি হালকা জ্যাকেট অবশ্যই রাখবেন। কারণ কখন যে হাড়কাঁপানো হিমেল হাওয়া বইতে শুরু করবে তা কেউ জানে না। সেই সঙ্গে হঠাৎ বৃষ্টির ঝাপটা থেকে বাঁচতে ছাতা কিংবা রেনকোট সঙ্গে রাখা বাধ্যতামূলক।
















