উত্তরাখণ্ডের রুদ্রপ্রয়াগ জেলায় অবস্থিত। পুরো অঞ্চলটি সৌন্দর্যের এক স্বর্গ। আছে বেশকিছু বেড়ানোর জায়গা। পুজোর মরশুমে সপরিবার ঘুরে আসতে পারেন। লিখলেন অংশুমান চক্রবর্তী।

উত্তরাখণ্ডের একটি ছোট জনবসতি ও উপত্যকা হল চোপতা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৬৮০ মিটার উচ্চতায় রুদ্রপ্রয়াগ জেলায় অবস্থিত। স্থানটি উত্তরাখণ্ড এবং উত্তর ভারতে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামে পরিচিত। অফবিট গন্তব্য হলেও চোপতা এখন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ভ্রমণের সময় পর্যটকরা বিভিন্ন দুঃসাহসিক কার্যকলাপ করতে পারেন। যেমন ক্যাম্পিং ও ট্রেকিং, স্নো ট্রেকিং, স্নো স্কিইং, রক ক্রাফট, রক ক্লাইম্বিং, র্যাপেলিং এবং আউটডোর গেমস।

পুরো অঞ্চলটি সৌন্দর্যের এক স্বর্গরাজ্য। যাঁরা নির্জন নিরিবিলি বেড়ানোর জায়গা পছন্দ করেন, তাঁরা চোপতা উপত্যকা ভ্রমণ করতে পারেন এবং উপত্যকা থেকে অল্প দূরে অবস্থিত হিমালয়ের অনেক চূড়া দেখে মুগ্ধ হতে পারেন। বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতে সমৃদ্ধ।

চোপতা এবং এর আশেপাশে আছে বেশকিছু বেড়ানোর জায়গা। অনেকেই ঘুরে দেখেন দেওরিয়া তাল। এটা চোপতা উপত্যকার একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। সারি গ্রাম থেকে ৩ কিলোমিটার পথ হেঁটে গেলে ৭,৯৯৯ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই সুন্দর হ্রদটিতে পৌঁছানো যায়। দেখা যায় পাইন, দেবদারু, রডোডেনড্রন ইত্যাদি গাছ। হ্রদে যাওয়ার এই পথ থেকে চারপাশের অরণ্যের পাশাপাশি চৌখাম্বা, নীলকণ্ঠ, বান্দরপুঞ্চ, কেদারনাথ এবং কালানাগের মতো সুবিশাল হিমালয় পর্বতমালার মনোরম দৃশ্য দেখা যায়। স্বচ্ছ জল এবং শান্ত পরিবেশের কারণে দেওরিয়া তাল একটি শীর্ষস্থানীয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

তুঙ্গনাথ মন্দির শিবের অনুসারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্দির। চোপতায় পর্যটকদের জন্য প্রধান দর্শনীয় স্থান। বিশ্বাস করা হয় যে, মন্দিরটি প্রায় ১০০০ বছরের পুরনো। তুঙ্গনাথ মন্দিরকে হিমালয়ের গাড়োয়াল অঞ্চলের ৫টি গুরুত্বপূর্ণ শিব মন্দিরের মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচনা করা হয়, যা পঞ্চ কেদার নামেও পরিচিত। ১২,০০০ ফুটেরও বেশি উচ্চতায় অবস্থিত। এত উচ্চতায় অবস্থিত হওয়ায়, শীতকালে মন্দিরটি বরফে ঢেকে যায়।

তুঙ্গনাথ মন্দির থেকে ১.৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চন্দ্রশিলা শৃঙ্গ চোপতার অন্যতম সেরা একটি দর্শনীয় স্থান। মন্দির চত্বর থেকে ১৩,০০০ ফুট উচ্চতায় এটা একটা চড়াই পথ। চূড়ায় পৌঁছালে নন্দাদেবী, ত্রিশূল, কামেত, চৌখাম্বা এবং থালায় সাগরের মতো পর্বতগুলোর অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায়।

মধ্যমহেশ্বর মন্দির ভগবান শিবকে উৎসর্গীকৃত। উত্তরাখণ্ডের পঞ্চ কেদারের মধ্যে অন্যতম। কিংবদন্তি অনুসারে, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর, পাণ্ডবেরা যুদ্ধে কৃত পাপের ক্ষমা লাভের জন্য ভগবান শিবকে খুঁজতে থাকেন। পাণ্ডবদের কৃতকর্মে গভীরভাবে বিচলিত হয়ে ভগবান শিব তখন তাঁদের এড়ানোর জন্য একটি ষাঁড়ের রূপ ধারণ করেন এবং সেই স্থানে আবির্ভূত হন, যেখানে আজ পঞ্চ কেদারটি অবস্থিত। তুঙ্গনাথ মন্দিরে ষাঁড়ের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দেখা গিয়েছিল এবং মধ্যমহেশ্বর মন্দিরে ষাঁড়টির নাভি দেখা গিয়েছিল, তাই এই মন্দিরে শিবের নাভি রূপের পুজো করা হয়।

৪৩০১ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত উখিমঠ মন্দির চোপতা উপত্যকা থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। তীব্র শীতকালে যখন কেদারনাথ ও মধ্যমহেশ্বর মন্দির বন্ধ থাকে, তখন শিবের বিগ্রহ পূজার জন্য এই মন্দিরে আনা হয়। এইকারণেই হিন্দুধর্মাবলম্বীদের কাছে উখিমঠ মন্দিরের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

ওঙ্কার রত্নেশ্বর মহাদেব মন্দির নাগ দেবতাকে উৎসর্গীকৃত। একে দেভারিয়া নাগমন্দিরও বলা হয়। মন্দিরটির একটি আকর্ষণীয় বিষয় হল, এর ভিতরে থাকা লিঙ্গমের উপর জল ঢাললে তা সাপের মতো ঢেউ তুলে নিচে বয়ে যায়। চোপতার কাছে সারি গ্রামে অবস্থিত এই মন্দিরে ১ কিলোমিটার দীর্ঘ চড়াই পথ হেঁটে পৌঁছানো যায়। এটা তুঙ্গনাথ মন্দিরের বিপরীতে অবস্থিত।

কাঞ্চুলা কোরাক কস্তুরী হরিণ অভয়ারণ্য হিমালয়ান কস্তুরী হরিণের জন্য একটি সংরক্ষণ কেন্দ্র। ৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এবং চোপতা থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে ঘন অরণ্যের মধ্যে অবস্থিত। অভয়ারণ্যটি কেদারনাথ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের একটি অংশ। এখানে শুধু হরিণই নয়, উপত্যকার উদ্ভিদকুল এবং স্থানীয় হিমালয়ান পাখিও দেখা যায়।

রোহিণী বুগিয়াল হল চোপতার একটি সুন্দর তৃণভূমি, যেখানে যাওয়ার ট্রেকটি চোপতা থেকে শুরু হয় এবং এতে প্রায় ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা সময় লাগে। এই ট্রেকটি মাঝারি স্তরের। ওক, রডোডেনড্রন এবং দেওদার গাছের ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। পথে উপত্যকায় বসবাসকারী বিভিন্ন প্রজাতির পাখিও দেখতে পাওয়া যায়। রোহিণী বুগিয়াল ট্রেকারদের স্বর্গরাজ্য হওয়ার পাশাপাশি ক্যাম্পিংয়ের জন্যও একটি উপযুক্ত জায়গা। যখন রডোডেনড্রন ফুল পুরোপুরি ফোটে, তখন এই তৃণভূমি দারুণভাবে সেজে ওঠে। ভ্রমণের সেরা সময় শরৎকাল। সবমিলিয়ে পুজোর মরশুমে সপরিবার চোপতা ভ্রমণ মনের মধ্যে অফুরান আনন্দের জন্ম দেবে।

 কীভাবে যাবেন?

কলকাতা থেকে প্রথমে ট্রেন বা বিমানে দিল্লি, হরিদ্বার বা হৃষিকেশ পৌঁছাতে হবে। সেখান থেকে সড়কপথে হৃষিকেশ বা হরিদ্বার হয়ে রুদ্রপ্রয়াগ ও উখিমঠ পেরিয়ে প্রায় ২০০-২২৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে চোপতা পৌঁছানো যায়। সময় লাগে প্রায় ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা।

 কোথায় থাকবেন?

চোপতায় সুইস ক্যাম্প, ইকো-রিসর্ট, বাজেট গেস্টহাউস এবং স্থানীয় হোমস্টে রয়েছে। এর আশপাশের এলাকা, যেমন বানিয়াকুণ্ড, দুগ্গলবিট্টা, উখিমঠ কিংবা সারি গ্রামে পছন্দ ও বাজেট অনুযায়ী থাকার জায়গা বেছে নেওয়া যায়।