'শনিবারের চিঠি'র প্রাণপুরুষ কবি-সাহিত্যিক সজনীকান্ত দাস। মৌলিক রচনার পাশাপাশি সমালোচনামূলক লেখাতেও ছিলেন সিদ্ধহস্ত। বিতর্কিত হয়েও স্বীকৃত ও অভিনন্দিত হয়েছিলেন আন্তরিক অনুসন্ধিৎসা, সাহিত্য-অনুরাগ, নির্ভেজাল পাণ্ডিত্যের জন্য৷ ২৫ অগাস্ট জন্মদিন। স্মরণ করলেন অংশুমান চক্রবর্তী।
বাংলাভাষার অন্যতম বিখ্যাত সাহিত্য-সাময়িকী ‘শনিবারের চিঠি’। ১৯২৪ সালে পথচলা শুরু। সাপ্তাহিক কাগজ। মূল স্বত্বাধিকারী অশোক চট্টোপাধ্যায়। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক যোগানন্দ দাস। তবে ‘শনিবারের চিঠি’র প্রাণপুরুষ ছিলেন কবি-সাহিত্যিক সজনীকান্ত দাস। এমএসসি পড়াকালীন এই পত্রিকায় যোগ দেন। ‘ভাবকুমার প্রধান’ ছদ্মনামে লিখতেন। ‘কামস্কাটকীয় ছন্দ’ কবিতাটি প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলার ব্যঙ্গ সাহিত্যে সুপ্রতিষ্ঠা পান।
তিনি ছিলেন সেই সময়ের বহু আলোচিত ও বিতর্কিত বর্ণময় এক সৃজনশীল সাহিত্য ব্যক্তিত্ব৷ বহুমুখী মননে, বৈচিত্র্যময় সৃষ্টিকর্মে ও গতিময় কর্মপ্রেরণায় সেই যুগের সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের একজন অপরিহার্য প্রতিনিধি ছিলেন৷ অসাধারণ লেখার হাত। মৌলিক রচনার পাশাপাশি সমালোচনামূলক লেখাতেও ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তাঁর সমালোচনার হুলে বিদ্ধ হয়েছিলেন বহু খ্যাতনামা লেখক। তীব্র অথচ হাস্যরসাত্মক সমালোচনার মাধ্যমে সমকালীন সাহিত্য কর্মকাণ্ডে বিশেষ প্রাণসঞ্চার করছিলেন।
তিনি এক সময়ে গান, চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য এবং বেতারভাষ্য রচনায় নৈপুণ্য ও পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন৷ ‘শনিবারের চিঠি’ ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে ‘প্রবাসী’, ‘মর্ডান রিভিউ’-সহ অন্তত আরও সাতটি পত্রিকার সঙ্গে তিনি নানাভাবে যুক্ত ছিলেন৷ এছাড়াও বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ-সহ আরও বিভিন্ন সারস্বত সংস্থা ও সমিতির সঙ্গেও জড়িয়ে ছিলেন তিনি৷ ‘পরিভাষা সংসদ’ ও ‘ভারতকোষ’ উপসমিতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। বাংলা সাহিত্যের সারস্বত প্রাঙ্গণে ষাটের বেশি বইয়ের লেখক সজনীকান্ত বিতর্কিত হয়েও স্বীকৃত ও অভিনন্দিত হয়েছিলেন তাঁর আন্তরিক অনুসন্ধিৎসা, সাহিত্য-অনুরাগ এবং সর্বোপরি নির্ভেজাল পাণ্ডিত্যের জন্য৷
একটা সময় রবীন্দ্র-বিরোধিতার কারণে নিন্দিত এবং সমালোচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে ‘শনিবারের চিঠি’-কে কেন্দ্র করে তা রূপান্তরিত হয়েছিল অকৃত্রিম ভক্তের আন্তরিক বন্দনায়৷ এর শ্রেষ্ঠ নিদর্শন, মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে সজনীকান্তর অনবদ্য সৃষ্টি ‘রবীন্দ্রনাথ : জীবন ও সাহিত্য’ শীর্ষক গ্রন্থটি৷ উৎসর্গ করা হয়েছিল ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়কে, যিনি সর্বপ্রথম সমবয়সী রবীন্দ্রনাথকে ‘বিশ্ব-কবি’ অভিধায় অভিনন্দিত করেছিলেন৷ সজনীকান্ত এই বইয়ের ভূমিকায় প্রথম বাক্যটিতে লিখেছেন, “পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ গীতিকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর৷” তারপর লিখেছেন, “রবীন্দ্রনাথ কবি-স্রষ্টা এবং দ্রষ্টা, সুতরাং ঋষি৷”
রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের পর প্রকাশিত হয়েছিল ‘শনিবারের চিঠি’র রবীন্দ্রসংখ্যা৷ এর পরের বৈশাখেই প্রকাশিত হয় সজনীকান্তের ‘পঁচিশে বৈশাখ’ নামে বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ৷ এই গ্রন্থের স্বত্ব-প্রসূত অর্থ কলকাতার সেই সময়ের রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্রে দান করা হয়েছিল৷ রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের পর সজনীকান্তের ‘মর্ত্য হইতে বিদায়’ শীর্ষক অসামান্য কবিতাটিও স্মরণ করার মতো৷ কবিতার রচনাকাল ৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৪১৷ ব্যথাহত বিপন্ন ভক্ত সজনীকান্তের শ্রদ্ধা নিবেদন অমর্ত্য-ধাম যাত্রী রবীন্দ্রনাথকে৷ কবিতাটি পরের দিনই, ৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৪১, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে অনুষ্ঠিত শোকসভায় পঠিত হয়৷
কবি ও নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়কে বাংলা কাব্যে ও নাটকে এক অনন্য ও স্পষ্টবাদী প্রতিভাদীপ্ত স্রষ্টা হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন সজনীকান্ত। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যৌথভাবে সম্পাদিত দ্বিজেন্দ্র-গ্রন্থাবলীর ভূমিকায় তিনি দ্বিজেন্দ্রলালের অকপট স্বদেশপ্রীতি ও সমাজচেতনার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলাম ও সজনীকান্তের সম্পর্ক মূলত তীব্র ব্যঙ্গ, সাহিত্যিক দ্বন্দ্ব আর প্রতিবাদের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। সজনীকান্ত তাঁর সম্পাদিত ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকার মাধ্যমে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ ও ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’-এর মতো জনপ্রিয় সৃষ্টির প্যারডি ও কড়া সমালোচনা করেছিলেন। অন্যদিকে নজরুলও রসিকতা করে সজনীকান্তকে ‘সজনে ঘণ্ট খাস’ বলে ডাকতেন। পরবর্তীকালে সজনীকান্তের বহু গানের সুর দিয়েছিলেন নজরুল। সজনীকান্তও আবেগময় কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তাঁর আত্মস্মৃতিতে। ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতায় ‘প্রতি শনিবারই চিঠিতে প্রেয়সী দেন গালি’— নজরুলের উক্তি সজনীকান্তকে ভাস্বর করে তুলেছিল।
জীবনানন্দ দাশের কবিতা ছিল সজনীকান্তের আক্রমণের সবচেয়ে বড় জায়গা। জীবনানন্দের কবিতা প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি তীব্রভাবে সমালোচনা করতেন। জীবনানন্দ ট্রাম দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর অবশ্য সজনীকান্ত তাঁর ভুল স্বীকার করেন এবং জীবনানন্দকে সত্যিকার মহৎ আধুনিক কবি হিসেবে মেনে নেন। এমন উপলব্ধি পরবর্তীতে তাঁকে বিশেষভাবে স্মরণীয় করে রেখেছে।
‘বাঙ্গালা গদ্যের প্রথম যুগ’, ‘বাংলা গদ্য সাহিত্যের ইতিহাস’ পড়লেই বোঝা যায়, কঠোর এবং কোমল— দুই ধরনের প্রবন্ধই রচনা করেছেন সজনীকান্ত। তাঁর প্রবন্ধ ছিল যুক্তিনির্ভর। ভাষা ছিল প্রাঞ্জল। তথ্যগত ত্রুটি ছিল না। তাঁর বিভিন্ন রচনায় দেখা যেত মেধা এবং মননের আশ্চর্য সহাবস্থান। তিনি ছিলেন যুগসন্ধিক্ষণের কবি, সাহিত্যিক, সম্পাদক, সমালোচক। অতীত এবং বর্তমানের মধ্যে রচনা করেছিলেন এক অদৃশ্য সেতু।
















