অবশেষে বিজেপি রাজ্য সভাপতি তাঁর আসল ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রটা সামনে এনেছেন। এতদিন খুব কষ্ট করে মুখোশ দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শাক দিয়ে তো আর মাছ ঢাকা যায় না! বিজেপি আসলে বিজেপিই।
বীরবলের সেই গল্পটা মনে আছে? রাজ দরবারে নুতুন আগত অতিথি নানা ভাষায় কথা বলছেন। রাজা বীরবলকে বললেন, ওর মাতৃভাষা কী তা জানাও। বীরবল এক রাত্রি সময় চেয়ে নিলেন। সেদিন রাতেই ওই ব্যক্তি যেখানে ঘুমিয়ে ছিলেন, সেখানে ঢুকে পড়ে তার গায়ে এক বালতি ঠাণ্ডা জল ঢালতেই মাতৃভাষায় চরম গালাগালি! শমীকের অবস্থা হয়েছে অনেকটা তেমনই হয়েছে। বিজেপির এজেন্ডার লেজে পা পড়তেই আসল স্বরূপ প্রকাশ্যে। কেউ তাঁর অবস্থান জানালেই ভাবা হচ্ছে বিজেপি বিরোধী। আসলে বাংলায় বিরোধী তো রাখা যাবে না। যেভাবে এক সময় তৃণমূল কংগ্রেস সব বিরোধীকে নিজেদের দিকে টেনে এনে বিরোধী শূন্য করার চেষ্টা চালিয়েছিল, বিজেপি এখন সেই পথেরই পথিক।
'বন্দে মাতরম' নিয়ে হঠাৎ বিজেপির হাওয়া তোলার চেষ্টা শুরু হয়েছে। অন্য রাজ্যের অন্তত ৬০ শতাংশ মানুষ বলতে পারবেন না গানটির রচয়িতা কে বা কোন উপন্যাসের অন্তর্গত। জাতীয় গীত নিয়ে বাংলার অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুর একটি সাক্ষাৎকারে তাঁর নিজের বক্তব্য রাখছিলেন। সে নিয়ে বিজেপির গাত্রদাহ শুরু হয়েছে। বিজেপির এটা অতিপরিচিত সংস্কৃতি। হয় তুমি আমার সঙ্গে সহমত হও নইলে তুমি দেশবিরোধী। তোমার জাত-ধর্ম-কাজ নিয়ে কাটাছেঁড়া হবে প্রকাশ্যে।
এবং পাঠক ভাবুন, কঙ্গনা রানাওয়াতের মতো একজন অভিনেত্রী এবং দুর্ভাগ্যক্রমে হয়ে যাওয়া সাংসদ ধর্মনিরপেক্ষতার পাঠ শেখাচ্ছেন শর্মিলা ঠাকুরকে। বলছেন হিন্দু-মুসলিম চোহদ্দির বাইরে বেরিয়ে এসে ভাবার চেষ্টা করুন!
কী বলেছিলেন শর্মিলা? 'অপরাজিতা'র অভিনেত্রী বলেছিলেন, এমন অনেক ধর্মবিশ্বাসী মানুষ এদেশে আছেন, যাঁরা বহু দেবদেবীতে বিশ্বাস করেন না। তাঁরা এক ও অদ্বিতীয় ঈশ্বরে বিশ্বাসী। বন্দে কালী, বন্দে দুর্গা— এমন পংক্তিগুলির জন্য কিছু কিছু ধর্মের মানুষের কাছে এই গান গ্রহণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে। সেই কারণেই এই গানের প্রথম দু’টি স্তবক যেগুলিতে মূলত মাতৃভূমির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসার কথা বলা হয়েছে, সেটুকুই বৃহত্তর পরিসরে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।... কঙ্গনার কথা ছেড়ে দেওয়া যাক, বিজেপি রাজ্য সভাপতি এতে আপত্তি দেখলেন কোথায়? বহু ভাষা, বহু ধর্ম, বহু জাতি নিয়ে তৈরি ধর্মনিরপেক্ষ ভারত। সেই ভারতের কথাই তো বলেছেন শর্মিলা। বিজেপি যে ভারতের কথা চাপিয়ে দিতে চায়, সেটা তো আসল ভারতের ছবি নয়! দেশের সংবিধানে যদি মানতে হয়, তাহলে সেটাই তো হওয়া উচিত!
এতে বড্ড গোঁসা হয়েছে রোজ নানা আত্মসমালোচনায় 'বিখ্যাত' শমীক ভট্টাচার্য। তিনি কী বললেন? তৈমুর ভারতে আক্রমণ চালিয়ে মন্দির ধ্বংস করেছে, এই দেশের মানুষকে জবাই করেছে, বলপূর্বক মানুষকে ধর্মান্তরিতকরণ করেছে, ধর্ষণ করেছে। যে অত্যাচার কথা ইতিহাসের পাতায় লেখা রয়েছে। সেই একই নাম ওঁর বাড়িতেও রয়েছে। নাতির নামকরণ করেছেন তৈমুর আলি খান। এইজন্য উনি বন্দেমাতরম নিয়ে যত কম কথা বলবেন তত মঙ্গল!
ভাবুন, রোজ যে বিজেপি রাজ্য সভাপতি বলছেন, এটা বাংলার সংস্কৃতি নয়, এটা বাংলার রুচি নয়, এটা বাংলার মানুষ ভালবাসেন না, তিনিই এমন কথা বলে দিলেন! নাতির নাম তৈমুর রাখাটা অপরাধ? যদি দেশের কোনও এলাকায় সৌমিক নামে কেউ ধর্ষণে অভিযুক্ত হন, তাহলে সেই নামে কেউ ছেলের নামকরণ করবে না! নাকি যারা নাম রেখেছিল তারা এফিডেফিট করে বদলে নেবে? নাকি, যে দামোদর সাভারকার ব্রিটিশদের সাহায্য করে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁর নাম দামোদর হওয়ায় কেউ সেই নাম আর ব্যবহার করেননি?
তৈমুর মানে লোহা। কোন তৈমুর দেশ আক্রমণ করেছিল, সেটা নাম রাখায় কেন বিবেচ্য হবে? শর্মিলা পুত্র সইফ আলি খান ও করিনা কাপুর তাঁদের সন্তানের জন্মের পর নামকরণ থেকেই বিজেপির তোপের মুখে। দাবি একটাই, তৈমুর নাম রাখা যাবে না। প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়। এবার টার্গেট শর্মিলা। কারণ, বিজেপির হিন্দুত্ব এজেন্ডায় পা দিয়ে ফেলেছেন সত্যজিতের অভিনেত্রী। এবং বিজেপি মনে করে, প্রথমেই ভয় দেখাও, থামাও। বন্দেমাতরম নিয়ে আমরা যা বলছি তার যেন অন্যথা না হয়। বিরোধীকে বলতে দিও না। এ ব্যাপারে গণতন্ত্র মোটেই পছন্দ নয় বিজেপির।
মাননীয় শমীক ভট্টাচার্যকে শুধু একটাই অনুরোধ, জাতীয় সঙ্গীতকে সম্মান করেন তো! অনুরোধ জনগণমন গানটি দয়া করে পুরোটা গেয়ে শোনান। একদিন অসংখ্য বুমের সামনে গাইতে না পারুন অন্তত আবৃত্তি করে শোনান!
পরিশেষে বলি, ভাগ্যিস বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বেঁচে নেই। তিনি যদি কোনও সমালোচনা করতেন, তাহলে নিশ্চিত শমীকরা বলতেন, সঙ্গে করে যে নাম নিয়ে ঘুরছেন, তারপর আর আপনি ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলবেন না!
সত্য সেলুকাস...
















