সুন্দর, পরিচ্ছন্ন, শান্ত শহর উত্তরাখণ্ডের পিথোরাগড়। জায়গাটার ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। আছে দুর্গ, মন্দির, হ্রদ ইত্যাদি। এখান থেকে হিমালয়ের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায়। পুজোর মরশুমে সপরিবার ঘুরে আসতে পারেন। লিখলেন অংশুমান চক্রবর্তী।
উত্তরাখণ্ডের মুকুটে অনেক রতন। কিছু রত্ন রয়েছে রাজ্যের কিনারায়। সেগুলো এতটাই সুন্দর যে কোনও ভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। রাজ্যের কুমায়ুন অঞ্চলে অবস্থিত পিথোরাগড় তেমনই একটি জায়গা। শহরটি যেমন সুন্দর, পরিচ্ছন্ন, তেমনই শান্ত। ১৬২৫ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই শহর পিথোরাগড় জেলার জেলা সদর। এই জায়গার ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। কেউ কেউ বলে এই জেলার নামটি এসেছে চন্দ রাজবংশের রাজা পিথোরা চন্দের নাম থেকে। অনেকের মতে এটা এসেছে চৌহান রাজপুত পৃথ্বীরাজ চৌহানের নাম থেকে। তিনি সওর উপত্যকায় পিথোড়াগড় নামে একটি দুর্গ তৈরি করেছিলেন। ১৩৬৪ সালে, উকুর রাজওয়ারের রাজা ভরতপাল এই অঞ্চল জয় করার পর, চতুর্দশ শতাব্দীর বাকি সময় তিন প্রজন্মের পাল বংশধরেরা পিথোরাগড় শাসন করেছিল। রাজত্বটি পিথোরাগড় থেকে আসকোট পর্যন্ত বিস্তৃত। একটি তাম্রপত্র অনুসারে, ১৪২০ সালে পাল রাজবংশকে চন্দ রাজারা পরাজিত ও বিতাড়িত করে। দোতির ব্রাহ্ম রাজবংশের বিজয় ব্রহ্ম রাজা হিসাবে সাম্রাজ্যের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। জ্ঞান চন্দের মৃত্যুর পরে ক্ষেত্রপালের নেতৃত্বে, পাল রাজারা আবার এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করে। মনে করা হয় যে, ১৪৪৫ সালে পিথোরাগড়ের তৎকালীন শাসক জ্ঞান চন্দের পূর্বপুরুষ ভারতী চন্দের সময়, চন্দবংশকে বিতাড়িত করে বাম রাজত্ব শুরু হয়। ষোড়শ শতকে, চন্দ রাজবংশ আবার পিথোরাগড় শহর দখল করে নেয় এবং ১৭৯০ সালে, পাহাড়ের উপর একটি নতুন দুর্গ তৈরি করে। চন্দ রাজবংশের শাসনামলে পিথোরাগড় শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে প্রভূত উন্নতি করেছিল। এই অঞ্চলের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল দূর-দূরান্তে। রাজাদের আমলের বেশকিছু প্রাচীন নিদর্শন আজও রয়েছে, যেগুলো পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। এছাড়াও আছে বেশকিছু দর্শনীয় স্থান।
পিথোরাগড় শহরে পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত পিথোরাগড় দুর্গ পর্যটকেরা ঘুরে দেখেন। ২০০ বছরেরও বেশি আগে কুমায়ুনের চন্দ রাজাদের শাসনামলে ‘গোর্খারা’ নির্মাণ করেছিল। পূর্বে এটা একটা তহসিল সদর দপ্তর ছিল, কিন্তু বর্তমানে এটা একটি জাদুঘর।পিথোরাগড় হ্রদ ও বাঁধ বদলানিতে অবস্থিত। এই জায়গাটা বেড়ানোর আদর্শ সময় সন্ধে বা ভোরবেলা।অনেকেই চন্দক পাহাড়ে বেড়াতে যান। শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে এটা এমন একটা জায়গা, যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে সুবিশাল হিমালয়ের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায়। এখানে রয়েছে মনু মন্দির। দর্শন করতে পারেন। আর্মি গুরুদ্বার, লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির, মহারাজা পার্ক এবং লাতেশ্বর মহাদেব এখানকার অন্যান্য দর্শনীয় স্থান।মহাদেব ও দেবী জয়ন্তীর প্রতি উৎসর্গীকৃত ধ্বজ মন্দির শহর থেকে সড়কপথে ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২১০০ মিটার উঁচুতে এই ট্রেকিং পথটি বেশ সুন্দর, তাই পিথোরাগড়ে গেলে এটা না দেখলে বড় ভুল হবে।
থাল কেদার আরএফে রয়েছে শিবমন্দির। এখানে শুধুমাত্র পিথোরাগড় অথবা নকুলেশ্বর মন্দির থেকে ট্রেকিং করে পৌঁছানো যায়।থাল কেদার মন্দিরে পৌঁছানোর পর যে পরিবেশ, সৌন্দর্য এবং আধ্যাত্মিকতা অনুভব করা যায়, তা এক অসাধারণ প্রাপ্তি। এটা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮৮০ মিটার উপরে অবস্থিত। স্কন্দ পুরাণে এর উল্লেখ পাওয়া যায়।প্রাচীন লাতিরুই রাজ্য হিসেবে পরিচিত আসকোট। এখানে দেখা যায় কস্তুরী হরিণ। এখানকার পাহাড়গুলো রডোডেনড্রন ফুলে ভরা। উপত্যকাগুলো মনোমুগ্ধকর এবং এখানে পঞ্চচুলি ও চিপ্পাকোট শৃঙ্গের মহিমান্বিত রূপ দেখা যায়। এর সীমান্ত নেপাল ও চিনের সঙ্গে সংযুক্ত। উচ্চতা ৬০০ মিটার থেকে ৬৯০৫ মিটার পর্যন্ত হওয়ায় এটা সব ধরনের ভ্রমণকারীদের জন্য একটি আদর্শ স্থান। ঘুরে আসা যায় পুরনো বাজার। এখানে হস্তশিল্প, তাঁত এবং পিতলের জিনিসপত্র কেনাকাটার সুযোগ রয়েছে।পিথোরাগড় জেলায় শারদীয়া দুর্গোৎসব বা নবরাত্রি অত্যন্ত ভক্তি ও উৎসাহের সঙ্গে পালিত হয়। পুজোর মরশুমে দুই-তিন দিনের জন্য সপরিবার ঘুরে আসা যায়।
কীভাবে যাবেন?
পিথোরাগড়ের নিকটতম বিমানবন্দর হল পান্তনগর বিমানবন্দর। ২৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। পিথোরাগড় থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত তানাকপুর রেলওয়ে স্টেশনটি হল নিকটতম রেল স্টেশন। এই রেলওয়ে স্টেশনটি উত্তর ভারতের প্রধান শহরগুলির সঙ্গে ভালোভাবে সংযুক্ত। এই রেলওয়ে স্টেশন থেকে পিথোরাগড় যাওয়ার জন্য ট্যাক্সি পাওয়া যায়। আঁকাবাঁকা সড়কপথ ধরে পর্যটকরা বাসের মাধ্যমেও গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন।
কোথায় থাকবেন?
পিথোরাগড়ে আছে বেশকিছু হোটেল এবং রিসর্ট। ফলে থাকা খাওয়ার কোনও অসুবিধা হবে না। খরচ মোটামুটি নাগালের মধ্যে। অবশ্যই স্বাদ নেবেন মোমো, থুকপা ও তিব্বতি খাবারের। এছাড়াও খাবেন আলু কে গুটকে, কুমাওনি থালি, ভাট কি চুরকানি, মিষ্টি খাবার বালমিঠাই, সিঙ্গোদি, রাস ইত্যাদি।
















