ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন বা SIR-কে ঘিরে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে নেমেছে বিরোধী শিবির। কিন্তু মামলা দায়েরের পরেই আবেদনে একাধিক ত্রুটি চিহ্নিত করল সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রি। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী-সহ ইন্ডিয়া জোটের একাধিক নেতার যৌথ আবেদনে মোট ১৪টি ত্রুটি ধরা পড়েছে। এমনকি, কোর্ট ফি বাবদ ২২০ টাকা কম জমা পড়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই আপত্তিগুলি মামলার নথিপত্র ও দাখিলের পদ্ধতিগত ত্রুটি সংক্রান্ত, মামলার মূল অভিযোগের বিষয়ে আদালতের কোনও রায় নয়।

সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রির আপত্তির তালিকায় রয়েছে একাধিক নথিগত অসঙ্গতি। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গের পরিচয়পত্রের স্পষ্ট ও পাঠযোগ্য প্রতিলিপি জমা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি, মামলার নয় জন আবেদনকারীর পক্ষে আইনজীবী নিয়োগের প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র জমা না পড়া কিংবা তাতে স্বাক্ষরের ঘাটতির বিষয়টিও সামনে এসেছে। যে নয় জন নেতার নথি নিয়ে আপত্তি উঠেছে, তাঁরা হলেন তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায়, সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব, আরজেডি নেতা তেজস্বী প্রসাদ যাদব, শিবসেনা (উদ্ধব গোষ্ঠী)-র সঞ্জয় রাউত, এম এ বেবি, ডি রাজা, মহুয়া মাজি, সুপ্রিয়া সুলে এবং ই টি মহম্মদ বশির। এ ছাড়াও আবেদনের কয়েকটি অংশে অতি ছোট অক্ষরে লেখা, অস্পষ্ট নথি, নির্দিষ্ট কিছু নথির রঙিন প্রতিলিপি না থাকা, পৃষ্ঠা অনুপস্থিত থাকা এবং পৃষ্ঠা নম্বরের অসঙ্গতি নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে। আঞ্চলিক ভাষায় থাকা কয়েকটি পৃষ্ঠা নিয়েও নথি সংক্রান্ত সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ২০২৫ সালের ২৪ জুনের SIR সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত-সহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথির পাঠযোগ্য প্রতিলিপি ও ডিজিটাল কপি জমা দেওয়ার বিষয়েও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, রাহুল গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়্গে-সহ মোট ১১ জন বিরোধী নেতা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে এই যৌথ আবেদন করেছেন। মামলায় নির্বাচন কমিশন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশীকে পক্ষ করা হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR প্রক্রিয়ায় অনিয়মের আশঙ্কা রয়েছে এবং এর ফলে যোগ্য ভোটারদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে পারে। সেই অভিযোগের তদন্ত ও ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিতেই শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তাঁরা। আবেদনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিকার চেয়েছেন বিরোধী নেতারা। তাঁদের প্রধান দাবিগুলি হল—

  • * অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন কমিটি গঠন করে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া ও সংশোধনের প্রক্রিয়া অডিট করা।
  • * মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন রাজ্যে চলতে থাকা SIR প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা।
  • * কোনও ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার আগে তাঁকে নোটিস দেওয়া এবং বক্তব্য জানানোর যুক্তিসঙ্গত সুযোগ নিশ্চিত করা।
  • * বুথভিত্তিক বাদ পড়া ভোটারদের তালিকা, নাম বাদ দেওয়ার কারণ এবং বয়স ও লিঙ্গভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করা।
  • * যোগ্য ভোটারদের নাম পুনরায় তালিকাভুক্ত করার ব্যবস্থা করা।
  • * SIR সংক্রান্ত নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত, নথি ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ড আদালতে পেশ করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখা।

আরও পড়ুন: মঙ্গলের সকালে ফের আটক ককরোচ নেতা আশুতোষ - সৌরভরা

পাশাপাশি, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের সাংবিধানিক বৈধতা পরীক্ষা, অনিয়মে দায়ী আধিকারিকদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা এবং ভোটার তালিকায় নাম তোলার প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় সুরক্ষারও দাবি জানিয়েছেন আবেদনকারীরা। এই মামলার প্রেক্ষাপটে সোমবার দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে পথে নামেন ইন্ডিয়া জোটের নেতারা। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকা সংক্রান্ত অভিযোগের তদন্তের দাবিতে সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে মিছিল করেন তাঁরা। এর আগে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের সঙ্গে দেখা করে স্মারকলিপি জমা দিতে চেয়েছিলেন রাহুল গান্ধী ও মল্লিকার্জুন খাড়্গে। সেই স্মারকলিপিতে নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে অভিযোগের পাশাপাশি পড়ুয়াদের গ্রেফতার, মেট্রো স্টেশন বন্ধ এবং ট্রেন বাতিলের মতো বিষয়ও তোলা হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। কিন্তু বিচারাধীন বিষয় নিয়ে এভাবে সাক্ষাৎ করা বিচারবিভাগের নিরপেক্ষতা ও ক্ষমতার পৃথকীকরণের নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে তাঁদের জানিয়েছিলেন প্রধান বিচারপতি। তবে আইন মেনে মামলা দায়ের করা হলে তা দ্রুত শুনানির জন্য বিবেচনা করা হবে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছে, আবেদনে চিহ্নিত ১৪টি ত্রুটি সংশোধন করে প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হবে আবেদনকারীদের। তার পরেই মামলাটি শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়া এগোতে পারবে।অর্থাৎ, ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন নিয়ে বিরোধীদের মূল অভিযোগের বিচার এখনও হয়নি।